কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: সংসারে অভাব-অনটনের বোঝা মাথায় নিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন মোর্শেদা বেগম। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয় জাবেদ আলীর সঙ্গে। জীবিকার তাগিদে ১৯৯৪ সালে তারা চলে যান টাঙ্গাইলে। সেখানে টাওয়াল ফ্যাক্টরিতে কাজ করলেও জীবনে স্বচ্ছলতা ছিল না। তবে ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় টুপি তৈরির কাজ শেখার মধ্য দিয়ে।
টাঙ্গাইলের কমলা বেগম নামের এক নারীর কাছ থেকে টুপি তৈরির কৌশল শেখেন তিনি। দিনে ফ্যাক্টরিতে কাজ, রাতে টুপি তৈরির কাজ-এভাবেই এগিয়েছেন সাফল্যের পথে। প্রথম টুপি বানিয়ে মজুরি পান মাত্র ২৮০ টাকা। কিছুদিনের মধ্যেই এক বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা তার কাজে মুগ্ধ হয়ে ৫০টি টুপির অর্ডার দেন। ওই অর্ডারে তিনি পান ১৫ হাজার টাকা। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে।
নিজ গ্রামে ফিরে ৮-৯ জন অসহায় নারীকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন টুপি তৈরির ব্যবসা। ধীরে ধীরে তার এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন আশপাশের ৪০-৫০টি গ্রামের ছয় হাজার নারী-পুরুষ। প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘নিপুণ হস্ত শিল্প সম্ভার’। এখানকার তৈরি বাহারি ডিজাইনের টুপি এখন যাচ্ছে বাহরাইন, সৌদি আরব, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে।
মোর্শেদা বেগম জানান, ফেনীর দুই ব্যবসায়ী তার কাছ থেকে টুপি কিনে বিদেশে বিক্রি করেন। তারা রেশমা সরবরাহ করেন, আর মোর্শেদা তার কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সুঁই-সুতা দিয়ে নকশা করা টুপি বানান। প্রতিটি টুপি বিক্রিতে তিনি ১১০-১৩০ টাকা লাভ পান। মাসে গড়ে ২.৫-৩ হাজার টুপি বিক্রি হয়। তার অধীনে টুপি তৈরির তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ১৬ জন সুপারভাইজার।
মোর্শেদা বলেন, “আমার জীবনে বড় কিছু পাওয়ার ইচ্ছা নেই। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি, একবার ওমরাহ হজ করেছি। ইনশাল্লাহ একদিন হজও করব। যতদিন বাঁচব, মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখব।”
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহায়তা পাননি। কেবল আশ্বাসেই থেমে গেছে সব উদ্যোগ। তিনি মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে টুপি উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
টুপি শ্রমিক মুক্তা বেগম বলেন, “চার বছর আগে মোর্শেদা আপার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করি। এখন সংসারে অভাব নেই, অনেকটা স্বাবলম্বী।”
শিক্ষার্থী লাইলী বেগম বলেন, “টুপি বানিয়ে লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছি। বাবা-মাকেও সাহায্য করতে পারি।”
আরেক কর্মী আকলিমা বেগম জানান, “রমজান ও কোরবানির ঈদের আগে টুপির চাহিদা বেশি থাকে। তখন প্রতি জন ৯-১০ হাজার টাকা আয় করতে পারি।”
কুড়িগ্রাম বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ জোনায়েদ বলেন, “পাতিলাপুর গ্রামের নারী উদ্যোক্তা মোর্শেদা বেগম জেলার গৌরব। তার তৈরি টুপি বিদেশে যাচ্ছে এবং হাজারো নারীর কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে এই শিল্প আরও এগিয়ে যাবে।”
রিপোর্টার্স২৪/প্রীতিলতা