শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: প্রতি বছরের এ সময়ে শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে দেশের তাঁতশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে বিপুল পরিমাণ শাড়ি, লুঙ্গি, গামছাসহ দেশীয় তাঁতবস্ত্র রফতানি হতো ভারতে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি (সাপটা) বাতিল, দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, স্থলপথে রফতানি বন্ধ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কের প্রভাবে এ বছর রফতানি কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমেছে। এতে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পে নেমেছে চরম সংকট। দিন দিন বন্ধ হচ্ছে তাঁত, বেকার হয়ে পড়ছেন হাজারো তাঁতী ও শ্রমিক।
তাঁতীরা জানান, ঈদুল ফিতরের পর থেকেই দুর্গাপূজার বাজারকে ঘিরে তাঁতবস্ত্র বিক্রির বড় মৌসুম শুরু হয়। প্রতিবছর এই মৌসুমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ও প্রদেশে ব্যাপক পরিমাণ দেশীয় শাড়ি সরবরাহ করা হতো। বিশেষত সিল্ক জামদানী, কাতান, রাজশাহী সিল্ক, বেনারসি, ব্লক ও চুমকির কাজ করা শাড়ির ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু এবার ক্রেতাদের আগমন হ্রাস পাওয়ায় শাহজাদপুর হাটে বিক্রি কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মোগল আমল থেকেই বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলে তাঁতশিল্পের প্রসার ঘটে। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের তথ্যমতে, শাহজাদপুর, বেলকুচি, এনায়েতপুরসহ সিরাজগঞ্জ জেলায় একসময় তাঁতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার। কিন্তু পরপর বন্যা, করোনা মহামারি, পাওয়ারলুমের আগমন এবং এবার রফতানি স্থবিরতায় প্রায় ১ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেক তাঁত মালিক পুঁজি সংকটে তাঁত বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।
শাহজাদপুর তাঁত শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আল মাহমুদ জানান, এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। স্থানীয় তাঁত ব্যবসায়ীরা জানান, ২০১০ সাল থেকে ভারতসহ ইউরোপের দেশগুলোতে নিয়মিত শাড়ি রফতানি হতো। শাহজাদপুর হাট থেকেই সাপ্তাহিক ২০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার শাড়ি রফতানি হতো, যা এখন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
তাঁত ব্যবসায়ী মাসুদ রানা বলেন, “হাটে ক্রেতা নেই, উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া, ঋণের কিস্তি শোধ করা এবং সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।”
হাটের ইজারাদার মো. নাদিম আলী আশা প্রকাশ করে বলেন, “সরকার যদি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।”
বাংলাদেশ স্পেশালাইজড টেক্সটাইল অ্যান্ড পাওয়ারলুম ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি আবু হাসান খান মনি ও কেন্দ্রীয় তাঁতী নেতা মুক্তিযোদ্ধা হায়দায় আলী বলেন, “রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও রফতানি সংকট তাঁতশিল্পকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে দেশের বৃহত্তম কুটিরশিল্পটি ধ্বংসের মুখে পড়বে।”
রিপোর্টার্স২৪/প্রীতিলতা