আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চাপ এবং নিষেধাজ্ঞার হুমকির মুখে যখন নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে, তখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ক্রেমলিন সূত্রের খবর অনুযায়ী, ডিসেম্বরে পুতিনের এই সরকারি সফর অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এটিই হবে পুতিনের প্রথম ভারত সফর, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে তার তেল বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের জেরে ভারতের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে, যার ফলে মোট শুল্ক ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন যে, ভারত পরোক্ষভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কিনে ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থায়ন করছে।
তবে ভারত দৃঢ়ভাবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ওয়াশিংটনের পদক্ষেপকে "অন্যায্য এবং ভণ্ডামি" বলে অভিহিত করেছে। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, তাদের অপরিশোধিত তেল আমদানি সম্পূর্ণরূপে জাতীয় স্বার্থ এবং বাজারের চাহিদা দ্বারা পরিচালিত হয়। ভারত আরও উল্লেখ করেছে যে, ইউরোপসহ অন্যান্য বৃহৎ অর্থনীতিগুলোও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন চাপ সত্ত্বেও, ভারত রাশিয়ার তেল বাণিজ্য বন্ধ করার কোনো লক্ষণ দেখায়নি, বরং রাশিয়ার পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলোর পর থেকে এটি ভারতের অপরিশোধিত তেলের প্রধান সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।
পুতিনের আসন্ন সফরটি বিশ্বজুড়ে পরিবর্তিত ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রেক্ষাপটে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে, ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কিছুটা চাপে রয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। রাশিয়া এই শুল্কের পদক্ষেপকে "অযৌক্তিক" এবং "দ্বিমুখী আচরণ" বলে অভিহিত করে ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে। রুশ দূতাবাস থেকে বলা হয়েছে, "যদি ভারতীয় পণ্য মার্কিন বাজারে যেতে না পারে, তবে সেগুলি রাশিয়ার দিকে আসতে পারে।"
পুতিনের এই সফরের মূল আলোচ্য বিষয়গুলির মধ্যে থাকবে অর্থনৈতিক, জ্বালানি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। উভয় দেশই তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করতে আগ্রহী। সোভিয়েত আমল থেকেই ভারত এবং রাশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দৃঢ় সম্পর্ক বিদ্যমান, এবং রাশিয়া এখনও ভারতের অন্যতম বৃহত্তম প্রতিরক্ষা অংশীদার।
সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে পুতিনের বৈঠকের পরপরই ডিসেম্বরের এই সফরের ঘোষণা এসেছে, যা দু'দেশের ঘনিষ্ঠতাকেই ইঙ্গিত করে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ব যখন বিভিন্ন শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তখন পুতিনের এই সফর ভারত ও রাশিয়ার সম্পর্কের দৃঢ়তা ও বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও একবার প্রমাণ করবে। এটি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মজবুত করবে না, বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকেও তুলে ধরবে।
রিপোর্টার্স২৪/সোহাগ