ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বেগুনবাড়ী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে হঠাৎ করেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এক অজানা প্রাণীর হানায়। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে শিশুসহ অন্তত ১১ জন মানুষ এ প্রাণীর আক্রমণে আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে তিনজনকে গুরুতর অবস্থায় ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, আক্রমণকারী প্রাণীটি দেখতে অনেকটা শিয়ালের মতো, তবে তার আকার ও আচরণ ছিল আরও হিংস্র। স্থানীয়দের ধারণা, এটি একটি হায়েনা বা হায়েনার দল হতে পারে, যা পাশ্ববর্তী ভারতীয় সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল থেকে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে।
ঘটনার অন্যতম ভুক্তভোগী বেগুনবাড়ী এলাকার আট বছর বয়সী শিশু শিমু। ভুট্টা তুলতে মাঠে গিয়ে ভয়াবহ হামলার শিকার হয় সে। শিশুটির বাবা মিজান বলেন, “বিকেলে শিমু আর তার ভাই রাকিব ভুট্টা তুলতে যায়। হঠাৎ করে ভুট্টার খেতের ভেতর থেকে একটি বড় প্রাণী ঝাঁপিয়ে পড়ে শিমুর ওপর। কিছু বোঝার আগেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে সে। পরে জ্ঞান ফিরলে দেখি কোমর থেকে পা পর্যন্ত মাংস ছিঁড়ে নিয়েছে প্রাণীটা।”
শিমুর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিমু ছাড়াও হামলার শিকার হয়েছেন পাশের গ্রামের ফাহিম (১৩), আনারুল ইসলাম (৪২), জাহানারা বেগম (৫৩), এনামুল হক (৫২), সাজ্জাদ (১২), আজমিরা (১৯), সাজিদ (১৬), আতুল (১৭) সহ আরও কয়েকজন।
আহত ফাহিম জানায়, “আমি বাড়ির সামনের রাস্তায় খেলছিলাম। হঠাৎই পেছন থেকে কিছু একটা কামড়ে ধরে। আমি চিৎকার দিলে লোকজন এসে বাঁচায়।”
অন্যদিকে ধনিপাড়া এলাকার জাহানারা বেগম বলেন, “এমন কামড় কখনো দেখিনি। একটা ভয়ঙ্কর প্রাণী আচমকা এসে পায়ে কামড়ে দেয়। এখনও হাঁটতে কষ্ট হয়।”
ইউপি চেয়ারম্যান বাবুল হোসেন বলেন, “দানারহাট এলাকায় বিকেলে প্রাণীটিকে ধাওয়া দিয়ে গ্রামবাসী ধরে ফেলে। পরে সেটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। কিন্তু তখন পর্যন্ত অন্তত ১০-১২ জনকে সে কামড়ে দিয়েছে।”
ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. রকিবুল আলম চয়ন জানান,“একটি হিংস্র অজানা প্রাণীর কামড়ে আহত হয়ে একাধিক ব্যক্তি হাসপাতালে আসে। তাদের অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাড়ি পাঠানো হয়েছে। কয়েকজনকে ভর্তি রাখা হয়েছে পর্যবেক্ষণে।”
ঠাকুরগাঁও সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান, “একটি ভিডিওতে প্রাণীটির ছবি দেখা গেছে। এটি শিয়াল না হায়েনা—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে অনেক ক্ষেত্রেই সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে হায়েনা জাতীয় প্রাণী বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। প্রাণীটি ধরার জন্য ফাঁদ পাতা ও নজরদারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
ঘটনার পর থেকেই এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সন্ধ্যার পর গ্রামের মানুষজন আর ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। শিশুদের একা বাইরে যেতে দিচ্ছেন না অভিভাবকরা।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন,“আমরা কখনো এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি দেখিনি। প্রাণীটি শুধু এক গ্রামে নয়, আশপাশের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে মানুষকে কামড়ে দিয়েছে। দিনশেষে হয়তো একটিকে মারা সম্ভব হয়েছে, কিন্তু আরও আছে কিনা জানি না।”
.
রিপোর্টার্স২৪/এস