শাহানুজ্জামান টিটু
ডাকসু নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ভরাডুবি এবং জাকসু নির্বাচনে ভোট বর্জন সংগঠনের দুর্বল সাংগঠনিক চিত্র ফুটে উঠেছে। এর সাথে সংগঠনটির অভিভাবক বিএনপির নীতিনিধারকদের চিন্তা ও কৌশল নিধারণে চরম ব্যর্থতার প্রমাণিত সত্যে পরিণত হয়েছে। যদিও অনেকে বলেন ডাকসু নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে এই কথার সাথে আমি একমত নই। কারণ ডাকসু ও জাকসুতে ছাত্রদলের পরাজয় থেকে বিএনপির জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা রয়েছে। এর মাধ্যমে জামায়াতের সম্ভাব্য উত্থান বিষয়টি সামনে এসেছে। শিবিরের সাংগঠনিক শক্তি জামায়াতের ভোটব্যাংককে সুসংহত করতে পারে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ভোটে জামায়াত একটি বড় চমক দেখাতে পারে। তারা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ইমেজ তৈরি করতে চাইছে। ফলে এটা বিএনপির জন্য বড় ঝুঁকি। ছাত্রদলের মতো দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো যদি বিএনপির মধ্যেও বিরাজ করে, তাহলে ২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতই "কিংমেকার" হয়ে উঠতে পারে।
ডাকসুতে ছাত্রদলের পরাজয় এবং জাকসুৃতে ভোট বর্জন এই অবস্থার জন্য মোটাদাগে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের দায় নেওয়া উচিত। কারণ নির্বাচনে লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড আদৌ ছিল কিনা তা দলটি নিতি নির্ধারকরা নিশ্চিত হতে পারেননি। এমন পরিস্থিতির মধ্যে ছাত্রদলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী দেশের রাজনীতি, তরুণ সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো এসেছে বিএনপি সেগুলো এখনো বুঝতে পারছে না।
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলকে অংশগ্রহণ করার পূর্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাহিদাগুলোর বিষয় নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ড আদৌ গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয়নি। কোনরকম যাচাই-বাছাই বা জরিপ না করে ছাত্রদলকে একা চ্যালেঞ্জের মুখে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি যদি এইধারা অব্যাহত রাখে তাহলে তাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে বলে রিশ্লেষকরা মনে করেন।
ইতিমধ্যে তাদের নেতা দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সর্তক করে বলেছেন,আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপির জন্য এতো সহজ নয়। দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের বাস্তবতা উপলব্ধি করার এবং জনগনণর পাশে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি গত কয়েক মাস ধরে বলছি, আপনারা যাত সহজ ভাবছেন, সামনের নির্বাচন এতো সহজ নয়। নিজের মনে যতই বড়াই করুন আরে বিএনপির তো শাখা-প্রশাখা একদম গ্রাম পর্যন্ত আছে, অন্যদের কি আছে? এই তো বড়াই করছেন। জনগণ ম্যাটারস, জনগণ ম্যাটারস। সেই জনগণ হচ্ছে আমাদের শক্তি, আমাদের সমর্থন। জনগণ সাথে না থাকলে কি হয় ৫ আগস্ট বুঝিয়ে দিয়েছে। কাজেই আমরা যদি ভুল করি জনগণ আবার কোনো একটা কিছু বুঝিয়ে দেবে। তখন কিন্তু পস্তাতে হবে, হা-হুতাশ করতে হবে। ডাকসু ও জাকসু নির্বাচন তারেক রহমানের আশঙ্কার কথায় প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু তার এই সতর্কবার্তা দলটির নেতাকর্মী নীতিনির্ধারকরা আমলে নিয়েছেন বলে মনে হয় না। যদি তাই হত তাহলে বিএনপিকে এই পরাজয় দেখতে হতো না।
এখন দেখা যাক ছাত্রদলের নির্বাচনের পরাজয়ের পেছনে আর কি কি কারণ থাকতে পারে। এর জন্য কি শুধুই বিএনপি দায়ী নাকি ছাত্রদলের দায়িত্বশীলরা দায়ী। যত দূর জানা যায় মূলত ছাত্রদলের দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থা, পকেট কমিটি গঠন, দলের মধ্যে কোন্দল, ৫ আগষ্ট ২০২৪ পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাধারণ ছাত্রদের পালস বুঝতে না পারার ব্যর্থতা সহ প্রতি পক্ষ সংগঠন ছাত্র শিবিরের কৌশলের কাছে ধরাশায়ী হয়েছে ছাত্রদল।
শিবির আওয়ামী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের আশ্রয় থেকে বিগত ১৬ বছর অতি গোপনে তাদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু ছাত্রদলের পক্ষে সেটা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ১৫ /১৬ বছর ধরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নিতে পারেনি। নানান হুমকি ধামকি মামলায় জড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম মুলত স্থবির হয়ে পড়ে। সংগঠনটি ক্যাম্পাসে ফিরতে পারেনি। কিন্তু এই দীর্ঘ সময় ধরে শিবির গোপনে তাদের সংগঠনের কার্যক্রম চালালেও ছাত্রদল এই সময়টিতে উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে।
পক্ষান্তরে শিবির ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থেকে তারা ভেতরে ভেতরে সংগঠন করেছে। এছাড়া শিবির একটি ক্যাডার ভিত্তিক সংগঠন। শিবির কৌশলে নারীর ভোটারদের টার্গেটে করে নারীদের তাদের আস্থায় নিতে পেরেছে। সে ক্ষেত্রে ছাত্রদল ব্যর্থ হয়েছে। তারা সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে নিজেদের পদপদবি দিকে। পদ বানিজ্যর অভিযোগ রয়েছে ছাত্রদলের নেতাদের বিরুদ্ধে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ ছাত্রদলকে আস্থায় নিতে পারেনি। কারণ বিগত সময়ে ছাত্রলীগের আগ্ৰাসি ভূমিকা, সিট বানিজ্য, গণরুম কালচার এসব সাধারণ শিক্ষার্থীদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। এজন্য তারা ভেবেছে ছাত্রদল যদি ডাকসু জিতে আসলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলো আবারো আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। এই আশংকা থেকে অনেকে ছাত্রদল থেকে মুখ ফিরিয়ে শিবিরকে আস্থায় নিয়েছে। ছাত্রদল নিজেদের মধ্যকার কোন্দল, সাংগঠনিক ব্যর্থতা চাঁপা দিতে ভোটে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। যদি সাংগঠনিক ভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতো তাহলে কেউ অনিয়ম করার সাহস পেতো না।
বিশ্ব রাজনীতিতে এখন সম্মুখ যুদ্ধ মোকাবেলার চেয়ে কৌশলে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার বিভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বন করছে। যুদ্ধ নামার পূর্বে তারা প্রতিপক্ষের বিভিন্ন দুর্বল বিষয়গুলো নিয়ে এনালাইসিস করে শত্রু পক্ষের সেই দুর্বল জায়গায় আঘাত হানছে। ঠিক একই কাজ করেছে ছাত্রশিবির।
সংগঠনটি ডাকসু নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই তারা ছাত্রদলের দূর্বলতার জায়গাগুলো টাগেট করে ওই জায়গাগুলোতে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। এবং সেভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নজর কাড়তে শিবির সফল হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।
কিন্তু ছাত্রদল কখনোই প্রতিপক্ষের বিষয়ে কোনো স্টাডি করেছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। শিবির যখন কৌশলী ভূমিকায় তখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ব্যস্ত দলের হাইকমান্ডকে খুশি রাখতে। দীর্ঘ দিন ধরে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা ছাত্রদলের পরাজয়ের আরেকটি কারণ অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং নিজেদেরকে অসম মনে করা। শিবিরের কৌশলের কাছে নির্বাচনের পূর্বে ছাত্রদল প্রথম পরাজিত হয়েছে। শিবির দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন না ঐক্যবদ্ধ ছাত্র সমাজের ব্যানারে নির্বাচন করে। তাদের প্যানেল গতানুগতিক ধারার বাইরে হিজাব বিহীন নারীদের প্রার্থী করেছে আবার আদিবাসী থেকে প্রার্থী করেছে। ফলে এসব বিষয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থা তৈরি হয়।
ডাকসু জাতীয় নির্বাচনে প্রভাবিত করে না বলে অনেকে মনে করে। কিন্তু এই নির্বাচন থেকে বিএনপিকে সতর্ক হতে হবে। ২০২৬ সালে ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত একটা বড় চমক দেখাতে পারে। তারা জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নাম ব্যবহার না করে ভিন্ন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে সেই নামে নির্বাচন অংশ নিতে পারে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।