স্টাফ রিপোর্টার: রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের নিচে আজ দুপুরে হঠাৎ বিয়ারিং প্যাড ছিটকে পড়ে আবুল কালাম নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এমন ঘটনা গত বছরও ঘটেছিল, যদিও তখন প্রাণহানি না ঘটলেও প্রকৌশলীরা বারবার সতর্ক করেছিলেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেট্রোরেলের রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা চলছে। একাধিকবার এমন ঘটনার পরও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ মানুষ বিপদের মুখে পড়েছে।
রোববার (২৬ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের সামনে ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। নিহত আবুল কালাম (৪০) শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঈশরপাটি গ্রামের বাসিন্দা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনি ব্যাগ হাতে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলেন। হঠাৎ মেট্রোরেলের ওপর থেকে একটি স্প্রিং ছিটকে পড়ে তার মাথায় আঘাত করে। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। স্প্রিংটি পাশের একটি চাপ-সিঙ্গারা দোকানেও আঘাত করে কাচ ভেঙে দেয়, এতে আরও দুজন আহত হন। স্থানীয়রা জানান, ফার্মগেট থেকে বিজয় সরণি পর্যন্ত যাওয়ার পথে একটি বাঁক আছে, যেখানে বিয়ারিং প্যাড ব্যবহার হয়। ট্রেন এখানে ধীরে চললেও স্প্রিং না থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এটি প্রথম ঘটনা নয়; এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আগারগাঁও–মতিঝিল রুটে একই ধরনের একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। তখন মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ এটিকে ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’ বলে দাবি করেছিল। যদিও সেই ঘটনায় কেউ মারা যাননি, প্রকৌশলীরা সতর্ক করে বলেছিলেন, বিয়ারিং প্যাডের বোল্ট সংযোগ ও চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ত্রুটি রয়েছে। কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি।
প্রকৌশল সূত্র জানায়, বিয়ারিং প্যাড বা কম্পন নিয়ন্ত্রণ স্প্রিং মূলত ট্রেন চলাচলের সময় লাইনের কম্পন শোষণ করে কাঠামোর স্থিতি রক্ষা করে। এসব যন্ত্রাংশের বোল্ট সংযোগ মাসিকভাবে পরীক্ষা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে নিয়মটি মানা হয়নি। দীর্ঘদিনের কম্পনের কারণে স্প্রিংটি আলগা হয়ে পড়ে।
ডিএমটিসিএলের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মেট্রোরেল প্রকল্পের খরচ সবচেয়ে বেশি। ভারতে এক কিলোমিটার মেট্রোরেলের নির্মাণ খরচ ৪০.৭৭ মিলিয়ন ডলার, রিয়াদে ১৬৬ মিলিয়ন ডলার, দুবাইয়ে ১৮৮ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু ঢাকায় একই ধরনের প্রকল্পের প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২২৬.৭৪ থেকে ২৫৩.৬৩ মিলিয়ন ডলার।
ফার্মগেট এলাকার দোকানদার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনার আগে কয়েক দিন ধরে ট্রেন চলাচলের সময় অস্বাভাবিক শব্দ ও কম্পন লক্ষ্য করা গিয়েছিল। কিন্তু কেউ বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। এলাকাবাসীর দাবি, মেট্রোরেলের নিচ দিয়ে চলাচল এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেট্রোরেল নির্মাণে সাফল্য থাকা সত্ত্বেও রক্ষণাবেক্ষণ এখনো বড় দুর্বল দিক। একবার স্প্রিং খুলে পড়ার পর যথাযথ অনুসন্ধান বা যান্ত্রিক পর্যালোচনা না হওয়ায় প্রাণহানি ঘটেছে। এই ঘটনায় মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন উঠেছে। বিয়ারিং প্যাডের মতো ভারী অংশ ছিটকে পড়া মানে নিয়মিত পরিদর্শন ব্যবস্থার ব্যর্থতা। আগের ঘটনায় যদি সব সংযোগ পুনরায় পরীক্ষা করা হতো, তাহলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং সড়ক ও পরিবহন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, এটা একবার নয়, পরপর দুইবার এমন দুর্ঘটনা ঘটল। মেট্রোরেল একটি মেগা প্রকল্প, যেখানে আমরা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছি এবং জাপানের অন্যতম স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে পরামর্শ সেবা নিয়েছি। এরপরও কেন এমন ঘটনা ঘটছে, তা বলা কঠিন। এখন বোঝা যাচ্ছে, নির্মাণের নকশা হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সমস্যা এবং তা বুঝে নেওয়ার ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় কন্ট্রাক্টর ও কনসালটেন্ট উভয়কেই দায়ী করতে হবে, কারণ একজনের প্রাণহানি ঘটেছে—এটা কোনো ছোট ঘটনা নয়।
তিনি আরও বলেন, কন্ট্রাক্টর ও কনসালটেন্টদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জাপানি কোম্পানিকেও প্রশ্নের মুখে আনা উচিত। দুইবারের ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, পুরো প্রকল্পের ভেতরে আরও দুর্বলতা থাকতে পারে। এই পরিস্থিতিতে একটি নিরপেক্ষ অডিট জরুরি, না হলে ভবিষ্যতে যেকোনো দুর্ঘটনার দায় নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএলের ওপর পড়বে।
ড. শামসুল হক আরও বলেন, পরামর্শপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আমাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নিয়েছে, পেশাদারিত্ব দাবি করেছে এবং জাপান থেকে এসেছে বলে নিজেদের যথেষ্ট যোগ্য বলে প্রচার করেছে। তারপরও দুর্ঘটনা ঘটেছে। আগের নন–টেকনিক্যাল কর্মকর্তারা এতটাই অজ্ঞ ছিলেন যে জাপানি পরামর্শের মান অনুযায়ী কাজ করতে পারেননি। তারা ধরে নিয়েছিলেন টেকনিশিয়ানরা দায়িত্ব নেবে, আর সেই সুযোগ নিয়েছে জাপানি প্রতিষ্ঠান। এখন সেই টেকনিশিয়ানদেরও দায়বদ্ধতার আওতায় আনা জরুরি।
তিনি বলেন, এই মেট্রোরেল প্রকল্প দীর্ঘ সময় নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে, তাই এটি সবচেয়ে মজবুত ও টেকসই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যথাযথ ব্যয় ও পরিশ্রম সত্ত্বেও যারা নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অবশ্যই ব্যর্থতার জন্য দায় নিতে হবে। তারা জানতেন যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে, তবুও অবহেলা করেছেন।
এদিকে, মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খুলে নিহত হওয়ার ঘটনার পর তদন্তের জন্য সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।
এ কমিটিতে আরও রয়েছেন বুয়েটের অধ্যাপক এ বি এম তৌফিক হাসান, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) সহকারী অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জাহিদুল ইসলাম, প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব এবং সড়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আসফিয়া সুলতানা।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, স্প্রিংটি যান্ত্রিক চাপে খুলে পড়েছে। তবে প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো আকস্মিক ত্রুটি নয়, বরং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির ফল।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানায়, এই দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এবং কেন এটি ঘটেছে, তা প্রকৌশল বা কারিগরি দিক থেকে নির্ণয় করা সম্ভব হবে। এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে কারণ সনাক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে। তারা আরও জানায়, মেট্রোরেল কবে নাগাদ পুনরায় চালু হবে, তা এখন বলা সম্ভব নয়। কোনো ঝুঁকি না থাকলে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু করা হবে এবং সময়সীমা সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করা হবে।
সেপ্টেম্বরে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমেদ বলেন, আগের কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর সব পিলার শারীরিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় এবং বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিদর্শন নিশ্চিত করা হয়েছিল। আমরা নিশ্চিত হয়েছিলাম যে কাঠামোগত কোনো ত্রুটি নেই এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি হ্রাস করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা সেই সুপারিশ অনুযায়ী পিলার ও বিয়ারিং প্যাডের স্থিতি পরীক্ষা করেছি। যেকোনো ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি চিহ্নিত করে তা মেরামত করা হয়েছিল। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, যাতে পুনরায় এমন দুর্ঘটনা না ঘটে।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর একই রুটে ফার্মগেট স্টেশনের নিকটবর্তী একটি পিলারে চারটি বিয়ারিং প্যাডের মধ্যে একটি স্থানচ্যুত হয়ে পড়েছিল। তখনও মেট্রোরেলের চলাচল প্রায় ১২ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। মেরামত কাজ শেষে রাত ৮টার পর ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হয়। কিন্তু এবার সেই অবহেলাই প্রাণহানির ঘটনায় রূপ নিল।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব