মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সিদ্ধাবাড়ি মেলা যেনো সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন। চারশো বছরের পুরানো এই মেলার আয়োজক হিন্দু ধর্মাম্বলীরা। মূলত সাধু-সন্যাসীদের পূজা-আর্চনা ও গান-বাজনার উদ্ধেশ্যে এই মেলা হলেও গ্রামীন ঐতিয্যের জিনিসপত্র খাবার-দাবারের পসরা বসে।
প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসে এই মেলাটি শুরু হয় এবং এক মাসব্যাপী চলে। তবে অন্যান্য ধর্মের মানুষদের কাছেও এটা তাদের নিজেদের মেলা। ধর্মীয় সম্প্রীতির এই উজ্জ্বল নজিরের ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। সিংগাইর উপজেলার সাহরাইল এলাকায় ঠিক কবে থেকে এই মেলার সূত্রপাত তার সঠিক ইতিহাস জানে না কেউ।
আয়োজক কমিটি জানান, এ মেলাটি ৪০০ বছরের বেশি সময় যাবত উদযাপিত হয়ে আসছে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও শুরুর হয়েছে সাহরাইল সিদ্ধাবাড়ি মেলা। তবে মেলার সেই আগের ঐতিহ্য নেই। মেলায় সার্কাস, পুতুল নাচ, যাত্রার আয়োজনও নেই এবার। তবে বসেছে হাজারো রকমের ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দোকান, বাহারী রসনাদায়ক খাদ্য সামগ্রীর সমাহার। এছাড়া বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী মেলায় বেচা-বিক্রি হচ্ছে।
মেলা ঘুরে দেখা গেছে, রাঁধুনীর মসলার কাঁচামাল ধনিয়া, শুয়াজ, জৈন, তরিতরকারী কাটাকাটির দা-বটি, বাচ্চাদের খেলনা সামগ্রী, বেতের তৈরি ধামা-কাঠা এখানে পাওয়া যাচ্ছে। সেইসঙ্গে বেদে বহরের চমৎকার আয়োজন মেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
মেলার একপাশে মিষ্টির দোকানগুলোতে দেখাগেছে লোকজনে ভরপুর। রসগোল্লা, চমচম, কালো জাম, মোহনভোগসহ বাহারি জিলেপীর মিষ্টির দোকানের গলি পরিপূর্ণ। মেলার আরেক আকর্ষণ গ্রামীণ মৃৎশিল্প ও কারুপণ্যের সমাহার।
মেলায় সবচেয়ে মজার দৃশ্য সাধু-সন্যাসীদের এরিয়া। বিভিন্ন বয়ষ্ক সাধুদের সাথে ক্ষুদে সাধুদের সমাগম হয় সাহরাইল মেলায়। এই মেলাটি অনেক জনপ্রিয় মেলা হিসেবে বিবেচিত। কারণ এই মেলাটি অনেক দূরদূরান্ত থেকে লোক এসে উপভোগ করে।
ঢাকা থেকে মেলায় ঘুরতে আসা অর্ঘদেব বলেন, মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সিদ্ধাবাড়ি মেলার কথা অনেক শুনেছি, এই বারই প্রথম আসা হল। সব মিলিয়ে ভালই লাগছে। মেলা উপভোগ করছি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও গুলশান থানা জিয়া সাইবার ফোর্সের আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম বলেন, এক সময় সারাবছর এলাকার মানুষজন পথ চেয়ে থাকতেন কখন মেলা শুরু হবে। মেলার প্রস্তুতি স্বরূপ সারাবছর টাকা জমাতেন। সেই টাকা দিয়ে বাহারি রকম খেলনা, নাগার দোলায় উঠা, পুতুল নাচ দেখাতেই ব্যয় করতেন অনেকেই, কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী মেলায় আগের ঐতিয্য আর নেই। কালের বিবর্তনে আগের মত আমেজ না থাকলেও চারশো বছর পুরোনো এই মেলা মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যকে ধারণ করে।
সামাজিক আনন্দ-বিনোদন ও ধর্মীয় উৎসবের কারণে একটি স্থানে অনেক মানুষ একত্রিত হয়। মেলার সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সব ধর্মের মানুষের সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটে। মেলাকে ঘিরে গ্রামীণ জীবনে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য।
সিদ্ধাবাড়ি মেলা পরিচিতি
কথিত আছে আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে মানিকগঞ্জের সায়েস্তা ইউনিয়নের নগরপাড়ায় হিন্দু ধর্মলম্বিদের বসবাসের আধিক্য ছিলো। সেই গ্রামে সম্ভুসিদ্ধা নামের একজন লোক ছিলো। ধারণা করা হয় তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তিনি অনেক কিছু আগাম বলতে পারতেন।
একদা ফাল্গুন মাসের (তখন সবে মাত্র আম-কাঠালের কুড়ি ধরেছে) কোনো একদিন গ্রামের কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে সম্ভুসিদ্ধাকে পরিক্ষা করার জন্য তার গৃহে যায়। তারা দেখতে পায় সম্ভুসিদ্ধা ধ্যান করছে।
ধ্যান ভাঙ্গার পর তিনি তাদের (আগন্তুক) জিজ্ঞেসা করে, তোমরা এখানে কেন এসেছো? জবাবে লোকগুলো বলে, আমরা আপনার কাছে পাকা আম, কাঠাল খেতে এসেছি। সম্ভুসিদ্ধা তাদের বলে, এখনতো আম-কাঠাল পাকে নাই আমি কিভাবে তোমাদের মনের বাসনা পূর্ণকরিব। লোকগুলো বলে উঠে তাহলে কিসের সম্ভুচাঁন আপনি?
তখন সম্ভুসিদ্ধার বুঝতে বাকি থাকেনা তারা সম্ভুকে পরিক্ষা করতে আসছে। এমতাবস্থায় তিনি তার শিষ্যকে বলে পেছনের গাছে আম পাকা আছে এবং কাঠাল গাছের মাঝের ডালে একটি পাকা কাঠাল আছে নিয়ে আসো। কথামত শিষ্য গিয়ে দেখে গাছে আম এবং কাঠাল পেকে মধুর মতো হয়ে আছে। সে ফলগুলো পেরে নিয়ে আসে।
তারপর সম্ভুসিদ্ধা শিষ্যকে বলে কারের উপরে আমার মায়ের হাতে ভাজা গরম মুড়ি আছে, সবাইকে আম, কাঠাল ও মুড়ির প্রসাদ দাও। অথচ তখন কেবল গাছে-গাছে সবে মাত্র নতুন কুড়ি। সম্ভুচাঁনের মা ও গত হয়েছে অনেক আগেই।
এসব কিছু চোখের সামনে ঘটতে দেখে হতবাক সবাই। বলে উঠে আপনি এক মহাপুরুষ। সকলেই সম্ভুসিদ্ধার কাছে ক্ষমা চেয়ে তার কাছে আনুগত্য স্বিকার করে।
জানা যায়, এ ঘটনার পর থেকে সিদ্ধাবাড়ি মেলা শুরু হয়। যা চারশো বছর ধরে এখনো চলমান। এ সিদ্ধাবাড়ির ভক্তবৃন্দ ঢাকার তাঁিতবাজার, পুরান ঢাকা, সাভারসহ দেশের গন্ডি পেরিয়ে ভারত সহবিভিন্ন দেশে রয়েছে। প্রতি বছর এই দিনে ভক্তরা বিভিন্ন জায়গা থেকে এই মেলায় ঘুরতে আসে এবং সম্ভুসিদ্ধাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
রিপোর্টার্স২৪/আরএইচ