রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: অন্তর্বর্তী সরকার আদৌ একটি নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে কিনা, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, গণতন্ত্র, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ‘নতুন বন্দোবস্ত’ বাস্তবায়নে কাঠামোগত ব্যর্থতার কারণেই এই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: আগামী সরকারের জন্য নাগরিক সুপারিশ’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, নতুন বন্দোবস্ত নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি এ কথা রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই স্বীকার করেছে। সংস্কারের ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কথা বলা হলেও সমাজের অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত না করায় এসব কাঠামো টেকসই হয়নি।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছিল, কিন্তু সামাজিক শক্তির সংগঠিত সমর্থন না থাকায় সেগুলো টেকেনি।
তার ভাষায়,নতুন বন্দোবস্তের দাবিদাররাই শেষ পর্যন্ত পুরোনো বন্দোবস্তের অংশ হয়ে পড়েছেন।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ব্যয়বহুল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ার ফলে পুরোনো কায়েমি স্বার্থ আবারও শক্ত অবস্থান ফিরে পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা পালালেও এবং রাজনীতিবিদরা আত্মগোপনে গেলেও শক্তিশালী আমলাতন্ত্র ফিরে এসেছে, কারণ পুরোনো বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় রক্ষক এই আমলাতন্ত্রই।
তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার অংশীজনদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এতে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সম্ভব হয়নি। এই প্রেক্ষাপটেই তার প্রশ্ন
সংলাপে গণমাধ্যম প্রসঙ্গেও সমালোচনা করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, অতীতে গঠিত মিডিয়া কমিশনের কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। যে মিডিয়া প্রতিষ্ঠান নিজের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে না, তার পক্ষে অন্যের কাছে স্বচ্ছতা দাবি করা নৈতিকভাবে দুর্বল।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে পেশাজীবী সংগঠনগুলো স্বাধীন ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ সুরক্ষিত হচ্ছে না। তার মতে,গণতন্ত্র না থাকলে এবং মালিকপক্ষ যদি লুটপাটতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হয়, তাহলে প্রকৃত গণমাধ্যম স্বাধীনতা সোনার পাথরবাটির মতো।
সংলাপে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম তাদের নাগরিক ইশতেহারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ করে। এতে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও গণতন্ত্রসহ মোট ১২টি নীতি-বিবৃতি ঘোষণা করা হয়।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান ও অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান এসব নীতি ও ১০টি জাতীয় কর্মসূচি তুলে ধরেন। কর্মসূচিগুলোর মধ্যে রয়েছে
সর্বজনীন ন্যূনতম আয়
শিক্ষার্থীদের স্কুল মিল প্রোগ্রাম
যুব ক্রেডিট কার্ড
জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড
কৃষক স্মার্টকার্ড
শ্রমবাজার তথ্য প্ল্যাটফর্ম
শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র
সমন্বিত নগর পরিবহন
সমন্বিত কর ও সম্পদ তথ্য ব্যবস্থা
জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি
স্বাস্থ্য কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষার প্রস্তাব
তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, প্রথম ধাপে বয়স্ক ভাতার আওতাভুক্ত ৬১ লাখ নাগরিককে জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ডের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে পরিবারপ্রতি বছরে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধা থাকবে এবং বার্ষিক ব্যয় হবে জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ।
এ ছাড়া যুব ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য সর্বজনীন ন্যূনতম আয় চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রস্তাবগুলো কীভাবে গ্রহণ করছে বা করছে না—তা নজরদারি ও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। তিনি মনে করেন, সচেতন ও সক্ষম নাগরিক সমাজ ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক উত্তরণে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করবে।
সংলাপে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি আসিফ ইব্রাহীম বলেন, ব্যবসায়ী, আমলাতন্ত্র ও ক্ষমতাসীন সরকারের মধ্যে গড়ে ওঠা আঁতাত থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। বাণিজ্য সংগঠনগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চা ও স্বাধীন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
এ সময় গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী শাহীন আনাম এবং মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামালও নাগরিক অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি