আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা গ্রহণের এক বছর পর যখন অনেকেই চীনের শ্লথ অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই বেইজিং অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়লেও চীন কানাডা ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
এর ফলস্বরূপ ২০২৫ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে। একই বছরে মাসিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি বৈশ্বিক লেনদেনে চীনা মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বুধবার সন্ধ্যায় চীন সফরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শীতল হয়ে পড়া দ্বিপাক্ষিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করাই তার সফরের মূল উদ্দেশ্য। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সফরের মধ্য দিয়ে চীন তার বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে পারে।
বস্টন কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক আলেকসান্দার তোমিচ বলেন, প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারের শেয়ার ও বন্ড বাজারের শক্তির ওপর ভর করে চীন এখন অনেক দেশের কাছে ‘স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
অলস্প্রিং গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টসের উদীয়মান বাজার শেয়ার বিভাগের সহ-প্রধান ডেরিক আরউইন বলেন, চীন নিজেকে একটি নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাণিজ্যিক অংশীদার যখন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন চীন পূর্বানুমেয়তা ও নিশ্চয়তার প্রস্তাব দিচ্ছে।
চার দিনের সফরে স্টারমার হচ্ছেন ২০১৮ সালের পর চীন সফরকারী প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। চলতি মাসের শুরুতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির চীন সফরের পরপরই তার এই সফর হচ্ছে। কার্নির সফরে দুই দেশ বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং নতুন কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে একটি অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। কার্নি সে সময় চীনকে “আরও পূর্বানুমেয় ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার” হিসেবে উল্লেখ করেন।
এদিকে জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্কসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ হামবুর্গে অনুষ্ঠিত নর্থ সি সম্মেলনে একটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি চুক্তিতে সই করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে শুধু চীনই নয়, অন্যান্য দেশও নতুন বাণিজ্য চুক্তির দিকে ঝুঁকছে। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা একটি বাণিজ্য চুক্তিতে মঙ্গলবার ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্মত হয়েছে, যার ফলে অধিকাংশ পণ্যে শুল্ক কমবে এবং ২০৩২ সালের মধ্যে ইউরোপীয় রপ্তানি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা চললেও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর বাণিজ্য ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উত্তেজনা তীব্র হয়।
এপ্রিল মাসে ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে ১০০ শতাংশের বেশি করলেও পরে আংশিকভাবে সেখান থেকে সরে এসে সাময়িক সমঝোতায় পৌঁছায়। অন্যদিকে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্যান্য বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও বাজারে সহায়তামূলক নীতি গ্রহণ করে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি ২০ শতাংশ কমলেও আফ্রিকায় রপ্তানি বেড়েছে ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ, লাতিন আমেরিকায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
আলেকসান্দার তোমিচ বলেন, “যেসব দেশ আগে চীনের প্রতি খুব একটা বন্ধুসুলভ ছিল না, তারাও এখন যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চয়তার কারণে চীনের দিকে ঝুঁকছে। যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি কঠিন হয়ে উঠছে, তত বেশি সুযোগ তৈরি হচ্ছে চীনের জন্য।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা সত্ত্বেও চীনের অর্থনীতি ২০২৫ সালে সরকারের নির্ধারিত ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করেছে। যদিও দেশটি দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও দীর্ঘস্থায়ী আবাসন খাতের মন্দার কারণে মূল্যস্ফীতিহীনতার চাপের মধ্যে রয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেইজিং, সাংহাইসহ বিভিন্ন অঞ্চলে টেলিকম, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতে বাজার প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করেছে চীন।
ডিসেম্বরে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ দাঁড়ায় রেকর্ড ১০০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে চীনের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ১০ বছরে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বাণিজ্য বিরোধের মধ্যেও চীনের আর্থিক বাজার শক্ত অবস্থানে রয়েছে। গত এক বছরে সাংহাই শেয়ারবাজার সূচক বেড়েছে ২৭ শতাংশ, যা যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের তুলনায় ভালো পারফরম্যান্স।
ডলারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় ইউয়ানের বৈশ্বিক ব্যবহার বাড়াতে চীন নতুন করে উদ্যোগ জোরদার করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা। বর্তমানে চীনের সীমান্তপারের লেনদেনের অর্ধেকের বেশি ইউয়ানে নিষ্পত্তি হচ্ছে, যা ১৫ বছর আগে প্রায় শূন্যের কোঠায় ছিল।
তবে চীনের এই বন্ধুসুলভ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে সতর্ক করছেন কিছু পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনাস্থা থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেইজিংয়ের প্রতি আস্থায় রূপ নেয় না।
তার ভাষায়, অনেক দেশই চীনের বাণিজ্যনীতি, অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের প্রবণতা এবং সামুদ্রিক ও ঐতিহাসিক বিরোধ নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের তুলনায় চীনকে কিছুটা সংযত মনে হলেও, বাস্তব আচরণ এখনও পুরোপুরি আশ্বস্ত করতে পারেনি। রয়টার্স প্রতিবেদন
রিপোর্টার্স২৪/এসসি