যশোর প্রতিনিধি: যশোরের চৌগাছা থানায় দায়িত্বরত অবস্থায় সাবেক ওসি আনোয়ার হোসেন ও এসআই মারুফ–এর বিরুদ্ধে মামলা রুজুর আগেই নিরীহ মানুষকে গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা দায়ের এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে হয়রানির গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। চৌগাছা থানার মাকাপুর গ্রামের ভুক্তভোগী স্নেহলতা পারভিন জানান, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে তার পরিবারকে ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে একের পর এক মামলা দেওয়া হয়।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাঁচটির অধিক মামলায় আসামিদের গ্রেপ্তারের ২ থেকে ৪ ঘণ্টা পর মামলা রুজু করা হয়েছে। এসব ঘটনার প্রমাণও মিলেছে। ভুক্তভোগী স্নেহলতা পারভিনের লন্ডনপ্রবাসী ভাই মো. রুবেন দেশে না থাকলেও তাকে আসামি করা হয়। একইভাবে তার ছোট ভাই আল ইমরানের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ আনা হলেও বাদীরা তাকে চেনেন না বলে জানা গেছে।
তথ্য পাওয়া যায়, ব্যারিস্টার মতুজা রাসেলের প্রত্যক্ষ মদদে হামিদা খাতুন, শহিদুল ইসলাম ও রাধাসহ কয়েকজনকে বাদী করে (২০২৫ সালে) গত বছরের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসে ধারাবাহিকভাবে মামলা দায়ের করেন। হয়রানির একটি মামলায় পুলিশের এসআই মারুফ নিজেই বাদী হয়েছে। তবে এজাহারে নাম থাকা অনেক আসামির ভাষ্য, তারা জানেন না কেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাদীরাও অনেক ক্ষেত্রে আসামিদের চেনেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত এক বছরে দায়ের হওয়া পাঁচটির অধিক মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিটি মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে এসআই মারুফ–এর ওপর। এ বিষয়ে, একই কর্মকর্তার হাতে ধারাবাহিকভাবে সব মামলার দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে তৎকালীন ওসি আনোয়ার হোসেন–এর সরাসরি মদদ ছিল এবং উদ্দেশ্য ছিল ভুক্তভোগী পরিবারকে হয়রানি করা।
ভুক্তভোগীরা একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে তদন্ত কর্মকর্তার পরিবর্তনের আবেদন করলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। বরং প্রতিবারই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এসআই মারুফকেই। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় প্রতিনিধি মাকাপুর গ্রামে অনুসন্ধান করলে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পল্লী চিকিৎসক দাবি করেন, স্নেহলতার পরিবারকে ফাঁসাতে থানার তৎকালীন ওসি আনোয়ার হোসেনকে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এছাড়া হয়রানির জন্য এসআই মারুফকে ৫ লাখ এবং এসআই রাজুকে ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। যদিও গ্রামবাসীরা বিষয়টি জানলেও হয়রানির ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না।
অভিযোগের বিষয়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাবেক ওসি আনোয়ার হোসেন বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার দায়িত্বকালীন সময়ে কোনো অর্থ লেনদেন বা হয়রানির ঘটনা ঘটেনি। মামলা রুজুর আগে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ফোন কল কেটে দেন। একই অভিযোগে এসআই মারুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
উল্লেখ্য, মৃত হায়দার আলীর রেখে যাওয়া প্রায় ৫০ বিঘা জমির সুষ্ঠু বণ্টন নিয়ে বিরোধের জেরেই এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। স্নেহলতা পারভিনের জানান, তার লন্ডনপ্রবাসী ভাই ব্যারিস্টার মতুজা রাসেল দীর্ঘদিন ধরে সম্পত্তি এককভাবে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। আর এ কাজে থানার তৎকালীন ওসি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে তার পরিবারকে হয়রানি করা হয়েছে।
স্নেহলতা পারভিন বলেন, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে পাঁচটি ভুয়া মামলা রুজু করা হয়েছে, যা ভিত্তিহীন বলে ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এখনো পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ের কোনো তদন্তের খবর পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগী পরিবার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে।