আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের একমাত্র কার্যকর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বুশেহর প্ল্যান্টে সাম্প্রতিক হামলা ঘিরে বড় ধরনের পারমাণবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের মধ্যে এই স্থাপনায় একাধিকবার হামলার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা জানায়, শনিবার সর্বশেষ হামলায় প্ল্যান্টের কাছাকাছি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে এক নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন এবং একটি পার্শ্ব ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত চারবার বুশেহর স্থাপনাটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্রটি ২০১১ সালে চালু হয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বর্তমানে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে। ভবিষ্যতে আরও দুটি ইউনিট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের স্থাপনায় সরাসরি হামলা হলে মারাত্মক তেজস্ক্রিয় পদার্থ—বিশেষ করে সিজিয়াম-১৩৭—বাতাস ও পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে খাদ্য, মাটি ও পানির উৎস দীর্ঘদিন দূষিত হওয়ার পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়বে।
জাতিসংঘের পরমাণু তদারকি সংস্থা International Atomic Energy Agency (আইএইএ) আগেই সতর্ক করে বলেছে, বুশেহরে সরাসরি হামলা হলে তা আঞ্চলিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, এমন হামলায় বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়বে, যার প্রভাব ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দেশে পৌঁছাবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও আশঙ্কা করছেন, এই কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে উপসাগরের পানি দূষিত হতে পারে। এতে সামুদ্রিক প্রাণী ও উপকূলীয় পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উপসাগরীয় দেশগুলো যেহেতু সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করে পানীয় জলের চাহিদা পূরণ করে, তাই তেজস্ক্রিয় দূষণ হলে বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি আগেই সতর্ক করে বলেছেন, বুশেহরে বড় ধরনের হামলা হলে পুরো উপসাগর অঞ্চলে পানি সংকট দেখা দিতে পারে। তাঁর ভাষায়, সমুদ্র পুরোপুরি দূষিত হয়ে যাবে, কয়েক দিনের মধ্যেই পানির সংকট তৈরি হবে—তখন আর জীবন থাকবে না।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। জেনেভা কনভেনশনের প্রোটোকল অনুযায়ী এমন স্থাপনায় হামলা নিষিদ্ধ, কারণ এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে জাপানের ফুকুশিমা (২০১১) ও ইউক্রেনের চেরনোবিল (১৯৮৬) দুর্ঘটনা দেখিয়েছে, পারমাণবিক বিপর্যয়ের প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তাই বুশেহর কেন্দ্রকে ঘিরে চলমান হামলা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি সূত্র: আল জাজিরা