আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ শুরু করেছে, তবে কূটনৈতিক সমাধানের আশা জোরালো হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ওয়াশিংটন ও দুবাই থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামাবাদে সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক ভেঙে যাওয়ার পরও উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টা চলছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও জানিয়েছেন, সংকট নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ থেমে নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছে এবং একটি চুক্তি করতে চায়। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এমন কোনো চুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে না, যাতে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকার পায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিজেদের ছাড়া অন্য কোনো জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেয়। ইরানের শর্ত ছিল—তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং নির্ধারিত ফি দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে হবে। বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।
এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজ এবং ইরানের আরোপিত ফি প্রদানকারী যেকোনো জাহাজের চলাচল প্রতিরোধ করবে। একই সঙ্গে ইরানের ‘ফাস্ট-অ্যাটাক’ নৌযান অবরোধের কাছে এলে সেগুলো ধ্বংস করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী নৌযান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর বন্দর লক্ষ্য করে প্রতিশোধ নেওয়া হতে পারে।
জাহাজ চলাচল বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, চীনা মালিকানাধীন ‘রিচ স্টারি’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে, যা অবরোধ শুরুর পর প্রথম। এর আগে জাহাজটি প্রণালীর কাছাকাছি গিয়ে ফিরে গিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের এ অবরোধ বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পেট্রোলিয়ামনির্ভর পণ্যের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবে এ পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক সমর্থন খুবই সীমিত। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা অবরোধে অংশ নেবে না; বরং জলপথ পুনরায় উন্মুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছে।
এদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যিনি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন, বলেছেন ইরানের সঙ্গে আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র কোথায় ছাড় দিতে পারে এবং কোথায় অনড় থাকবে তা তেহরানকে স্পষ্ট করা হয়েছে। তবে সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
ছয় সপ্তাহের সংঘাতের পর যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তা এখন ঝুঁকির মুখে। মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগামী বা সেখান থেকে বের হওয়া সব দেশের জাহাজের ওপর সমানভাবে এই অবরোধ কার্যকর করা হবে। তবে ইরান ছাড়া অন্য গন্তব্যে যাতায়াতকারী জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালীতে ‘নিরপেক্ষ চলাচল’ বাধাগ্রস্ত হবে না।
ইরানের এক সামরিক মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপকে ‘দস্যুতা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ইরানের বন্দর হুমকির মুখে পড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না। দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডসও সতর্ক করে জানিয়েছে, প্রণালীর দিকে অগ্রসর হওয়া যেকোনো সামরিক জাহাজ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করবে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধে ইরানের নৌবাহিনী প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং কেবল অল্পসংখ্যক দ্রুতগামী নৌযান অবশিষ্ট রয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অবরোধের কাছাকাছি এলে এসব নৌযান দ্রুত ও কঠোরভাবে ধ্বংস করা হবে।
এদিকে, লেবাননেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর দখলের লক্ষ্যে অভিযান চালিয়েছে, যা তারা ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান হিসেবে উল্লেখ করেছে। এতে একজন ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং তিনজন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী।
জাতিসংঘে পাঠানো এক চিঠিতে ইরান অভিযোগ করেছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে সহায়তা করেছে। এজন্য এসব দেশের কাছে ক্ষতিপূরণও দাবি করেছে তেহরান।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি