নড়াইল জেলা প্রতিনিধি : মহাদেব শিবকে তুষ্ট করতে নড়াইলে আগুন-সন্ন্যাসী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় জ্বলন্ত অগ্নিপথে খালি পায়ে হাঁটেন সন্ন্যাসীরা। সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে নড়াইল সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের কোড়গ্রাম বারোয়ারী মন্দির চত্বরে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১৬ জন সন্ন্যাসী অংশ নেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাটি খুঁড়ে তৈরি করা হয়েছে লম্বা একটি গর্ত। সেই গর্তে ফেলা হয়েছে কয়েক মণ কাঠ। আগুন জ্বালানোর জন্য দেওয়া হয়েছে কিছু পাটকাঠি। আর ওই কাঠ আগুনে পুড়ে পরিণত হয়েছে জ্বলন্ত অগ্নিপথে। খালি পায়ে নির্ভয়ে সেই পথ দিয়ে একে একে হেঁটে যাচ্ছেন সন্ন্যাসীরা। ঢাক-ঢোল ও শঙ্খধ্বনির তালে তালে ভক্তিময় পরিবেশে কিছু সময় ধরে চলে এই অগ্নিপথে হাঁটা। ভক্তদের চোখে বিস্ময় আর মুখে প্রার্থনা।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি আগুন-সন্ন্যাস পূজা নামে পরিচিত। তারা বলেন, মহাদেব শিবকে তুষ্ট করতে প্রতিবছর বাংলা বছরের শেষ সপ্তাহজুড়ে বিভিন্ন পূজার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো আগুন-সন্ন্যাস পূজা। চৈত্রসংক্রান্তির রাতে এই পূজা করা হয়। কাঠ পুড়িয়ে জ্বলন্ত পথ তৈরি করে তার ওপর দিয়ে হাঁটার মধ্য দিয়ে মহাদেব শিবের আরাধনা করা হয়। সেই সঙ্গে সমাজের শান্তি, কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করা হয়।
পরিমল পরামান্য নামে এক সন্ন্যাসী বলেন, আগুন-সন্ন্যাস শুধু শারীরিক সাহসের নয়, মানসিক ও আধ্যাত্মিক শুদ্ধতারও এক প্রতীক। সারা দিন উপবাস থাকা, মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সব ধরনের খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা—এসবই এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণের সাধনা। এই আচার মূলত আত্মোৎসর্গ ও বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ, যেখানে বিশ্বাস করা হয় মহাদেব শিবের কৃপায় আগুনও কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এ ধরনের রীতি সাধারণত আত্মশুদ্ধি, ঈশ্বরের প্রতি অটল ভক্তি এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবেই দেখা হয়।
আগুন-সন্ন্যাস দেখতে আসা এক দর্শনার্থী বলেন, প্রতিবছর এখানে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পূজা সচরাচর সব জায়গায় হয় না। তাই অনেক মানুষ এটি দেখতে এখানে আসেন। এই পূজার মধ্য দিয়ে আমরা ভগবান শিবের কাছে সবার মঙ্গল কামনা করি।
এর আগে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে একই এলাকায় বিদ্যুৎ মল্লিকের বাড়ির আঙিনায় খেজুর-সন্ন্যাসী পূজা করা হয়। এতেও ১৬ জন সন্ন্যাসী অংশ নেন। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কাঁটাযুক্ত খেজুর গাছের নিচে বাজানো হচ্ছে ঢাক-ঢোল। সেই সঙ্গে চলছে উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি। একদল সন্ন্যাসী খেজুর গাছ জড়িয়ে ধরে আছে। আর দলনেতা পুরোহিত সাদা ধুতি ও লাল গামছা কোমরে জড়িয়ে হাতে থাকা ছড়ি খেজুর গাছে লাগিয়ে মন্ত্র পাঠ করছেন। কয়েকশ মানুষ গাছের চারপাশ ঘিরে অপলক দৃষ্টিতে দেখছেন এ দৃশ্য।
এরই মধ্যে একজন সন্ন্যাসী উঠে পড়েন খেজুর গাছের মাথায়। পরপর আরও কয়েকজন সন্ন্যাসী গাছে উঠে পড়েন। গাছের মাথা থেকে খেজুর ছুড়ে দিচ্ছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীদের দিকে। প্রসাদ হিসেবে এ খেজুর পেয়ে খুশি ভক্তরা।
খেজুর-সন্ন্যাসী পূজায় অংশ নেওয়া সন্ন্যাসী সুদর্শন চক্রবর্তী বলেন, চৈত্র মাসে পাটস্নান করানোর পর থেকেই আমরা মহাদেব শিবের নামে উপবাস থাকি এবং নিয়মিত পূজা-অর্চনা করি। তিনি আরও বলেন, শিবভক্ত বানরাজ তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নাচ-গান করেন এবং শরীর থেকে রক্ত বের করে তা উৎসর্গ করেন। বানরাজের এই আত্মত্যাগে শিব সন্তুষ্ট হন। শিবকে তুষ্ট করতেই আমাদের এই আয়োজন।
চৈতী মল্লিক নামে এক নারী বলেন, এখানে প্রতিবছর শিব পূজা উপলক্ষে খেজুর-সন্ন্যাসী, কাঁটা-সন্ন্যাসী ও আগুন-সন্ন্যাসী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। আগামীকাল মঙ্গলবার নীল পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
পূজার পুরোহিত সচিন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, চৈত্র মাসে শিব যখন রুদ্ররূপ ধারণ করেন, তখন রুদ্ররূপী শিব রাহুসেন রাজাকে ষোল সন্ন্যাসী উপস্থিত করে পাটস্নান করিয়ে উপাসনা করার নির্দেশ দেন। সেই থেকে এই পূজার প্রচলন। ভক্তরা চৈত্র মাসে এই পূজা করে থাকেন। মহাদেব শিবকে তুষ্ট করতেই এই পূজার আয়োজন।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন