নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: সড়কের উপর থেকে অপহরণ করা হয়েছিল স্থানীয় এক কাউন্সিলর, জ্যেষ্ঠ এক আইনজীবী ও তাদের গাড়িচালকসহ সাতজনকে। তিনদিন পর তাদের মরদেহ ভেসে ওঠে শীতলক্ষ্যা নদীতে, যা সারাদেশে তখন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
এই ঘটনার ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও সাতখুন মামলার রায় এখনো কার্যকর হয়নি। রাষ্ট্রীয় আইন কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাটির রায়ে র্যাব কর্মকর্তাসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড ও বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজার রায় আপিল বিভাগে বহাল থাকলেও তা এখন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশনে ‘লিভ টু আপিল’ কার্যক্রমে আটকে আছে।
ফলে, দীর্ঘ সময়েও রায় কার্যকর না হওয়াতে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক (লিংক রোড) থেকে অপহরণের পর হত্যার শিকার হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকার, নজরুলের সহযোগী তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন, স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও আইনজীবী চন্দনের গাড়িচালক ইব্রাহিম।
গাড়িচালক জাহাঙ্গীর খুন হওয়ার একমাস পর জন্ম নেওয়া তার একমাত্র সন্তান রোজা আক্তার জান্নাতের বয়সও তার বাবার মৃত্যুদিবসের সমান। বাবার আদর থেকে বঞ্চিত এ শিশুর কাছে বাবার স্মৃতি মানে কেবল পুরোনো ছবি।
জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর চুক্তিভিত্তিতে চাকরি করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে। তার একার উপার্জনেই কোনোমতে সংসার টানছেন। থাকেন শ্বশুরবাড়ির একটি ঘরে। সন্তানকে পড়াচ্ছেন একটি স্থানীয় মাদরাসায়।
“আমার মেয়ে তো জন্মের পর থেকে বাবাকে দেখেনি। মাদরাসায় অন্যদের বাবাকে দেখলে তার মনেও খুব কষ্ট হয়, বাসায় এসে কান্নাকাটি করে। কিন্তু তার বাবাকে যারা নির্মমভাবে খুন করলো, মেয়েটাকে এতিম করলো, তাদের কোনো শাস্তি এখনো দেখলাম না। এই শাস্তি কবে নিজের চোখে দেখতে পাবো, তাও জানি না। খালি দিন গুনছি আমরা, বলছিলেন নুপুর।
রায় কার্যকরের দীর্ঘসূত্রতায় আসামিরা শাস্তি পাবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান সাবেক কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বিউটিও। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সারাদেশ তোলপাড় করে তোলা মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি। কিন্তু এখন তিনি আশা করছেন অন্তত বিএনপি সরকার এ বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হবে।
সবকিছু চাক্ষুস প্রমাণিত, এখানে তো কোনো লুকোচুরি নাই। ঘটনার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বলছিলেন, তারা সরকারে আসলে বিচারটি করবেন। এখন আমরা সেই আশায় আছি, বলেন বিউটি
বিচারের আশায় দিন গুনছেন নিহত তাজুলের বৃদ্ধ বাবা আবুল খায়েরও। “জীবদ্দশায় বিচার দেখে যেতে পারবো কিনা, সেইটাও সন্দেহ”, যোগ করেন খায়ের।
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত এই মামলার রায়ে সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা উচ্চ আদালতে যান।
মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, নিহত নজরুল ইসলামের সঙ্গে দন্ডিত নূর হোসেনের পুরোনো দ্বন্দ্ব ছিল। দু’জনই ছিলেন নাসিকের কাউন্সিলর। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব পরে লোমহর্ষক সাতখুনের ঘটনায় রূপ নেয়। ঘটনার দিন আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে ফিরছিলেন নজরুল। যদিও তার বাড়ি ফেরা আর হয়নি।
এদিকে, ২০১৮ সালের আগস্টে উচ্চ আদালত ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। এরপর আপিল করা হয়। কিন্তু গত আট বছর ধরেই মামলাটি শুনানির অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) আবুল কালাম আজাদ জাকির।
তিনি বলেন, “আপিল বিভাগেও মামলাটি নিষ্পপ্তি হয়ে গেছে। কিন্তু পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে ‘লিভ টু আপিল’ প্রসিডিংসে আটকে আছে বিষয়টি। এই কার্যক্রমে যদিও সময় লাগে, কিন্তু এক্ষেত্রে বেশি লাগছে। আমরা অ্যাটর্নি জেনারেল স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল, এটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি।
রিপোর্টার্স২৪/মিতু