ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: নৈশভোজের অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গুলি থেকে বেঁচে যাওয়ার পর অনলাইনে ভ্রান্ত তথ্য বা গুজবের বন্যা বয়ে গেছে। নতুন করে এবং ভিত্তিহীনভাবে দাবি করা হচ্ছে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ট্রাম্প নিজেই হত্যাচেষ্টার নাটক সাজিয়েছেন।
ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলে সাংবাদিকদের নৈশভোজের ওই আয়োজন হয় গত শনিবার। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। হোটেলের বলরুমের বাইরে গুলির পরপরই তাদেরকে অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। দুই বছরের ব্যবধানে ট্রাম্পের কোনো অনুষ্ঠানে এটি তৃতীয় দফায় হত্যাচেষ্টার ঘটনা।
ঘটনাটির পর অনলাইনে ট্রাম্পবিরোধী অ্যাকাউন্টগুলো থেকে ছড়ানো বিভিন্ন পোস্ট যাচাই করেছে এএফপি। এতে একটি ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পাওয়া গেছে। যেখানে দাবি করা হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে অজনপ্রিয় যুদ্ধসহ নেতিবাচক সংবাদ থেকে দৃষ্টি সরাতে হোয়াইট হাউস এই গুলির ঘটনা সাজিয়েছে।
গুজব পর্যবেক্ষণের সংস্থা নিউজগার্ড জানিয়েছে, গুলির ঘটনার মাত্র দুইদিনের মধ্যে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম এক্সে ছড়ানো বিভিন্ন পোস্ট ৮ কোটি বার দেখা হয়েছে। যেসব অ্যাকাউন্ট থেকে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলোতে পেনসিলভানিয়া ও ফ্লোরিডার ঘটনাকেও নাটক বলে দাবি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পেনসিলভানিয়ায় এক নির্বাচনী প্রচারসভায় ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছিল। এতে তিনি কানের পাশে আঘাত পান। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ফ্লোরিডার গলফ ক্লাবেও এমন ঘটনা ঘটে।
এ ধরনের বয়ান মূলত একটি বামপন্থী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব থেকে জন্ম নিয়েছে। গবেষকরা এটিকে ‘ব্লুঅ্যানন’ বলে চিহ্নিত করেন। এই নামের ‘ব্লু’ শব্দটি নেওয়া হয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতীকের রঙ থেকে। অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, ২০২৪ সালে ট্রাম্পের ওপর হামলা ও নির্বাচনের ফলাফল ছিল সাজানো। এই তত্ত্বের জন্ম হয়েছে ‘কিউঅ্যানন’ ধারণার প্রতিক্রিয়া হিসেবে। ডানপন্থি ‘কিউঅ্যানন’রা বিশ্বাস করেন, ট্রাম্প মূলত দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
নিউজগার্ডের সোফিয়া রুবিনসন এএফপিকে বলেন, কিছু পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। সেগুলোতে আগের ঘটনাগুলোকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে দাবি করা হয়েছে, হত্যাচেষ্টার নাটক সাজানো ট্রাম্পের কৌশলের অংশ। সহানুভূতি পাওয়া এবং নেতিবাচক সংবাদ থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্য তিনি এই কৌশলের আশ্রয় নেন।
‘ঘৃণার সংস্কৃতি’
গুলির ঘটনার মতো কোনো খবর প্রচারের পরপরই সামাজিক মাধ্যমে তা নিয়ে ব্যাপক পরিসরে ‘সার্চ’ বা খোঁজ করা হয়। ওই সময় প্রায়ই মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
সবশেষ শনিবারের ঘটনার পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের হাত ছিল- এমন কোনো প্রমাণ নেই। সোমবার হোয়াইট হাউস এ ঘটনার পেছনে ‘বামপন্থী ঘৃণার সংস্কৃতি’কে দায়ী করেছে। বলা হচ্ছে, কোল অ্যালেন (৩১) নামের সন্দেহভাজন ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর যাবজ্জীবন সাজা হতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের ঘটনার পর রাশিয়া ও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে আছে, ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর সঙ্গে হামলাকারীর যোগাযোগ থাকার দাবি।
গবেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ডেমোক্র্যাটিক বা রিপাবলিকান উভয় পক্ষের সমর্থকরা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে উঠছেন। মূলধারার গণমাধ্যমের প্রতি অবিশ্বাসের কারণে অনেকে পক্ষপাতদুষ্ট প্রভাবশালীদের কাছে থেকে তথ্য জানছেন। এই প্রবণতাই এমন পরিস্থিতির তৈরি করেছে।
‘অর্থ আয়ের হাতিয়ার’
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে গবেষণাকারী মাইক রথচাইল্ড এএফপিকে বলেন, বামপন্থী বিশেষ করে উদারপন্থী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা নাটকীয় হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সমর্থক। এখন ডানপন্থীদের মধ্যেও এটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। কারণ তারা ট্রাম্পের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন।
রথচাইল্ড বলেন, এসব তত্ত্বের আওতায় ট্রাম্পকে একজন কারসাজিকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রমাণ হিসেবে ভ্রান্ত ধারণা, ভাইরাল ভিডিও এবং মানুষের মুখে প্রচলিত গল্পকে জুড়ে দেওয়া হয়।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে সমর্থক কিংবা বিরোধী; উভয়পক্ষের সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক মার্কিন নাগরিক হতাশ। এই পরিস্থিতিতে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। প্রভাবশালী কনটেন্ট ক্রিয়েটররা প্রায়ই চাঞ্চল্যকর গুজব ছড়াতে উৎসাহ পান। কারণ এটি অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানো এবং এক্সের মতো প্ল্যাটফর্ম থেকে আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নটর ডেমের অধ্যাপক ওয়াল্টার শেইরার এএফপিকে বলেন, কোনো দাবি যত বেশি চমকপ্রদ হয়, আয়ও তত বেশি। বর্তমানে সরাসরি রাজনীতি করার চেয়ে ‘রাজনৈতিক ব্র্যান্ডকে’ কীভাবে অর্থ আয়ের কাজে লাগানো যায় সেটিই মূখ্য হয়ে উঠছে। এমন ধারা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ট্রাম্পের ভিত্তি এমনিতেও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব