আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত দেশটির বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম Axios-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের বন্দরগুলোতে চলমান অবরোধ তুলে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তার নেই। এতে কার্যত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিয়ে আলোচনার অগ্রগতির সম্ভাবনাও নাকচ হয়ে যায়।
ট্রাম্প দাবি করেন, বোমা হামলার তুলনায় এই অবরোধ বেশি কার্যকর। তার ভাষায়, ইরান “চরম চাপে” রয়েছে এবং পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। তিনি আরও বলেন, তেহরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, ইরান আলোচনায় ফিরতে হলে আগে অবরোধ প্রত্যাহারের শর্ত দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সম্প্রতি তেহরান একটি সীমিত সমঝোতার প্রস্তাব দেয়, যেখানে হরমুজ প্রণালিতে তাদের অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছিল। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই অবস্থায় তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন এবং দ্রুত কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর তাড়া নেই।
অবরোধের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরান-সংশ্লিষ্ট অন্তত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ জব্দ করেছে। পাশাপাশি গত কয়েক সপ্তাহে আঞ্চলিক জলসীমায় ৩৯টি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও সমুদ্র আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কয়েকটি জাহাজ জব্দ করেছে।
এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলারের বেশি ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম বেড়ে ৪ দশমিক ২২ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধের আগে ৩ ডলারের নিচে ছিল।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অভিযোগ করেছেন, ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করতে চাইছে। তবে তিনি বলেন, ইরান এই চাপ মোকাবিলা করে বিজয়ী হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন Press TV-ও জানিয়েছে, মার্কিন অবরোধের জবাবে শিগগিরই “ব্যতিক্রমী ও বাস্তবধর্মী” পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
পারমাণবিক ইস্যুতেও দুই দেশের অবস্থান এখনো বিপরীতমুখী। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করলেও নিজস্বভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার দাবি করছে। বিপরীতে ট্রাম্প প্রশাসন চায়, ইরানের পুরো পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা হোক।
এছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি সীমিত করা এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবিতেও ইরান অনড় রয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক দফা আলোচনা হলেও তাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যেই বুধবার ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপ করেন। পরে ক্রেমলিন জানায়, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে বিরোধ নিরসনে রাশিয়া একাধিক প্রস্তাব দিয়েছে এবং এ বিষয়ে ইরান, উপসাগরীয় দেশ, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির প্রেসিডেন্ট মিরজানা স্পোলিয়ারিকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় স্কুল, হাসপাতাল ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাসহ বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির বিষয় তুলে ধরা হয় এবং এসব হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে নিন্দা জানানো হয়।