ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ত্রিবেণী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মাফুজা খাতুনের বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও সেবাপ্রার্থীদের সাথে চরম দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ মানুষের সেবক হওয়ার কথা থাকলেও তার বিরুদ্ধে উঠেছে প্রতিবন্ধী ও মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড করে দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। এমনকি এ বিষয়ে সংবাদকর্মী হিসেবে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগকারীর ‘একেবারে গাল টেনে ছিঁড়ে ফেলে দেবো’ বলে হুমকি দিয়েছেন।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ত্রিবেণী ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মাফুজা খাতুন সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রতিটি প্রতিবন্ধী এবং মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ডের জন্য ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা করে দাবি করেন। ‘টাকা না দিলে কার্ড মেলে না’ এমন অভিযোগ এখন ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। এছাড়া সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুর রহমানের সাথে যোগসাজশ করে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে সরকারি অর্থ লুটেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্যানেল চেয়ারম্যানের স্বামী শামসুল হোসেন।
সম্প্রতি, ওই ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের গফুর মন্ডলের বাড়ি হতে আলিম মন্ডলের বাড়ি এবং মজনু মুন্সির বাড়ি হতে মিলন মন্ডলের বাড়ি পর্যন্ত ১৫৫ মিটার রাস্তা এইচবিবি করণে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তায় অত্যন্ত নিম্নমানের ইটের টুকরো ব্যবহার করা হয়েছে এবং ইটের নিচে বা উপরে পর্যাপ্ত বালু দেওয়া হয়নি। এমনকি রাস্তার দুই পাশে যে এজিং দেওয়ার কথা, তাও সঠিকভাবে দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় এলাকাবাসীর আশঙ্কা, সামান্য বৃষ্টি বা ভারি যানবাহন চললেই যেকোনো সময় রাস্তাটি ঢলে ভেঙে পড়বে। স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম নামের একজন বলেন, ‘চেয়ারম্যান সরকারি টাকা পকেটে ভরার জন্য নামমাত্র কাজ করে আমাদের ধোঁকা দিচ্ছেন। ৩ নম্বর ইট আর বালু ছাড়াই কোনোমতে ইট বিছিয়ে রাখা হয়েছে। এজিং ঠিক না থাকায় রাস্তা এখনই নড়বড়ে হয়ে আছে। আমরা এই দুই নম্বর কাজের প্রতিকার চাই এবং এই দুর্নীতিবাজ প্যানেল চেয়ারম্যান ও পিআইসি ইউপি সদস্যের অপসারণ চাই।’ ভুক্তভোগী মুনির হোসেন অভিযোগ করেন, ‘আমার ভাই অভি ইসলামের জন্য প্রতিবন্ধী কার্ড করতে মা ও ভাই ইউনিয়ন পরিষদে গেলে চেয়ারম্যান মাফুজা খাতুন তাদের কাছে টাকা দাবি করেন। তারা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটির ঘটনা ঘটে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর আগেও স্ত্রীর জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্ড করতে গেলে চেয়ারম্যান আমার কাছে ৭ হাজার টাকা দাবি করেন।’ তরিকুল নামে একজন অভিযোগ করেছেন, ‘স্ত্রী রাজিয়া খাতুনের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্ড করতে চেয়ারম্যানের কাছে গেলে আমার কাছে ৪ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় চেয়ারম্যান জানিয়ে দেন, টাকা না দিলে কোনোভাবেই কার্ড করে দেওয়া হবে না।’
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা যাচাই করতে গত (মঙ্গলবার ২৯ এপ্রিল) রাতে এই প্রতিবেদক ত্রীবেণী ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মাফুজা খাতুনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি মেজাজ হারিয়ে ফেলেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্যানেল চেয়ারম্যান চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কে দিয়েছে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ? তাকে ধরে নিয়ে আসেন একেবারে গাল টেনে ছিঁড়ে ফেলে দেবো। এরকম কোনো অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে কেউ দিতে পারবে না।’
এদিকে একজন জনপ্রতিনিধির মুখে এমন আক্রমণাত্মক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের বিষয়ে এলাকার সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা অবিলম্বে তদন্ত সাপেক্ষে ওই প্যানেল চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। শ্রীরামপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম নামের একজন বলেন, ‘প্যানেল চেয়ারম্যানকে ইউনিয়ন পরিষদে নিয়মিত পাওয়া যায় না। জরুরি প্রয়োজনে বা কোনো ফাইলে স্বাক্ষর নিতে গেলে তাকে পরিষদে না পেয়ে গ্রামবাসী ও সেবাপ্রার্থীদের তার বাড়িতে গিয়ে ধরণা দিতে হয়। এতে আমরা সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছি।’ অভিযুক্ত পিআইসি ও ইউপি সদস্য আজাদুর রহমান বলেন, ‘আমি নিয়ম অনুযায়ী যা বরাদ্দ পেয়েছি সেরকই কাজ হয়েছে। কোনো অনিয়ম করিনি।’
জেলার নাগরিক অধিকার আদায়ের সংগঠক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘একজন জনপ্রতিনিধি যখন পেশাদার গণমাধ্যমকর্মীর সাথে মুঠোফোনে এমন আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলেন এবং অভিযোগকারীদের প্রকাশ্যে ‘গাল টেনে ছিঁড়ে ফেলার’ হুমকি দেন, তখন তা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত শঙ্কার বিষয়। যদি একজন সাংবাদিকের সাথেই তিনি এমন আচরণ করার সাহস পান, তবে অসহায় সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের সাথে তিনি প্রতিনিয়ত কী ধরনের দুর্ব্যবহার করেন, তা সহজেই অনুমেয়। এই ধরনের আচরণ ও দুর্নীতি একইসূত্রে গাঁথা। আমরা অবিলম্বে ওই প্যানেল চেয়ারম্যান এবং তার সঙ্গে জড়িতদের স্ব স্ব পদ থেকে অপসারণ করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি, যাতে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থা অক্ষুণ্ন থাকে।’
এ বিষয়ে শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘যদি কোনো জনপ্রতিনিধি রাস্তা নির্মাণে অনিয়ম করে ওই কাজের জন্য তিনি বিল পাবেন না তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং যে অর্থ তিনি তুলেছেন তা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে। এছাড়া সরকারি কোনো কাজে অর্থ দাবি ও সেবাগ্রহীতার সাথে কোনোভাবেই খারাপ ব্যবহার করতে পারেন না। এ বিষয়টি আমি ইতিমধ্যে অবগত হয়েছি এবং তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রিপোর্টার্স২৪/এসএন