পশ্চিমবঙ্গ প্রতিনিধি: কংগ্রেস, তৃণমূল ও বিজেপি ঘুরে রাজনীতির নানা অধ্যায় পেরিয়ে এবার নিজেই দল গড়ে নির্বাচনে বাজিমাত করলেন মুর্শিদাবাদের হুমায়ুন কবীর। বাবরি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসা এই নেতা তৃণমূল ও বিজেপি- রাজ্যের দুই প্রধান শক্তিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নিজের দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি) গঠন করেন নির্বাচনের মাত্র দুই মাস আগে।
দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মমতা ব্যানার্জীর ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে শুরু করে শুভেন্দু অধিকারীর নন্দীগ্রাম কেন্দ্রেও। যদিও এসব কেন্দ্রে এজেইউপি প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য ফল করতে পারেননি, কিন্তু দলের চেয়ারম্যান হুমায়ুন নিজে মুর্শিদাবাদের দুটি কেন্দ্র-নওদা ও রেজিনগরে জয় পান।
নওদায় তৃণমূল প্রার্থী ও বিদায়ী বিধায়ক সাহিনা মুমতাজকে ২৭,৯৪৩ ভোটে ও রেজিনগরে আতাউর রহমানকে ৫৮,৮৭৬ ভোটে পরাজিত করেন তিনি। ফল ঘোষণার পরই হুমায়ুনের সমর্থকরা আবির নিয়ে রাস্তায় নেমে উদযাপন করেন। রাজ্যজুড়ে গেরুয়া ঝড়ের মধ্যেও তার এই জয়কে ব্যতিক্রমী সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমর্থকদের মুখে শোনা যায় স্লোগান- ‘মুর্শিদাবাদের নবাব হুমায়ুন কবীর জিন্দাবাদ’।
হুমায়ুন মানেই চমক, আবার বিতর্কও। গত কয়েক মাসে তিনি রাজ্য রাজনীতির অন্যতম আলোচিত মুখ। ২০১১ সালে কংগ্রেসের বিধায়ক, ২০১৬ সালে নির্দল, ২০২১ সালে তৃণমূল ও ২০২৬ সালে নিজের দল এজেইউপির একমাত্র জয়ী প্রার্থী- এভাবেই তার রাজনৈতিক পথচলা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভরতপুরের তৎকালীন বিধায়ক হুমায়ুনকে দলীয় অবস্থানের বিরোধিতা করে বাবরি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দেওয়ায় তৃণমূল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কারের পরও তিনি বেলডাঙায় বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেখান থেকেই ঘোষণা দেন, তৃণমূলকে ‘শিক্ষা দিতে’ তার দল নির্বাচনে লড়বে। এমনকি তিনি দাবি করেন, রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীও তিনিই নির্ধারণ করবেন।
নিজেকে ‘একগুঁয়ে’ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি যেমন, আমি তেমন। নইলে সাইকেল দোকানি থেকে ট্রাক ব্যবসায়ী কিংবা অধীর চৌধুরীর অনুগামী থেকে মন্ত্রী হওয়া হতো না।
দল গড়েই ২৯৪টি আসনে লড়াইয়ের ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় দেড়শ আসনে প্রার্থী দেয় এজেইউপি। তাদের মধ্যে কয়েকজন ভোটের আগেই তৃণমূলে যোগ দেন, আবার কেউ কেউ রাজনীতি ছাড়ার কথাও জানান।
অবিশ্বাস্যভাবে, ভোটের আগে হুমায়ুন নিজেও বলতে পারেননি ঠিক কতজন প্রার্থী তার ‘হুইস্ল’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৪৩টি আসনে লড়াই করে এজেইউপি, যার মধ্যে জয়ী একমাত্র প্রার্থী হুমায়ুন নিজেই।
বেলডাঙায় মসজিদ নির্মাণ শুরু করলেও তিনি ভোটে লড়েন নওদা ও রেজিনগর থেকে। নওদায় ভোটের আগে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন তিনি। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটারদের লক্ষ্য করেছেন বলেও স্বীকার করেন।
ধর্মীয় রাজনীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে তিনি বলেন, কেউ যদি হিন্দু হিন্দু করে, আমি তো মুসলমান মুসলমান করবই।
‘একলা চলো’ কৌশলে ভোটে নামেন হুমায়ুন। প্রথম দফার ভোটে নওদায় তাকে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা যায়। ভোটের আগের রাতে বোমাবাজির ঘটনাও ঘটে। ভোটের দিন এক বুথে তাকে দেখে তৃণমূল কর্মীরা ‘চোর চোর’ স্লোগান দেন, যার জবাবে তিনি পাল্টা তেড়ে যান। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে বেগ পেতে হয়।
তৃণমূল প্রার্থী সাহিনা মুমতাজ অভিযোগ করেন, ভোটের দিনও হুমায়ুন ‘সিটি’ বাজাচ্ছিলেন। জবাবে হুমায়ুন বলেন, সিটি আমার প্রতীক, বাজাতেই পারি। এই অধিকার নির্বাচন কমিশনই দিয়েছে। এখন নওদার পাশাপাশি রেজিনগরেও তার ‘সিটি’র আওয়াজ শোনা গেছে।
দুটি আসনে জয়ের পর এখন প্রশ্ন- হুমায়ুন কোন আসন রাখবেন, আর কোনটি ছাড়বেন ও কাকে দেবেন। রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করা এই নেতার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর সবার। সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব