দৌলতপুর প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে পদ্মা নদী থেকে অবাধে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী চক্রের প্রত্যক্ষ মদদে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দিন-রাত বালু উত্তোলন করা হলেও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। এতে হুমকির মুখে পড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও নদীতীরবর্তী বসতবাড়ি।
জানা গেছে, পদ্মা নদীর দৌলতপুর অংশে বালু উত্তোলনে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা প্রকাশ্যে অমান্য করা হচ্ছে। উপজেলার মরিচা ও ফিলিপনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় রাত-দিন চলছে বালু কাটার মহোৎসব। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবাদ বা বাধা দিতে গেলে সাধারণ মানুষকে হুমকি-ধামকি, এমনকি প্রাণনাশের ভয় দেখানো হয়। অতীতে মারধর ও গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে পদ্মার চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা গেছে, মরিচা ও ফিলিপনগর ইউনিয়নের পদ্মারচরের একাধিক স্থানে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি নদীভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ইতোমধ্যে বহু ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কোথাও কোথাও বালু ফেলার কারণে আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মরিচা ইউনিয়নের বৈরাগীরচর ভাদু শাহ মাজারসংলগ্ন এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঘেঁষে সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান, মরিচা ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বাদল হোসেন ভেগু ও টগর মোল্লার নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে রাইটা-মহিষকুন্ডি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে বলে আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয়রা।
এছাড়া ভুরকিরচর, মাজদিয়াড়, ঠান্টিতলা এলাকাসহ পদ্মার বিভিন্ন চরে একাধিক প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। শুধু নদী থেকেই নয়, জেগে ওঠা চরের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকেও জোরপূর্বক বালু উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন শত শত ট্রলিতে বালু উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতি স্টিয়ারিং গাড়ি বালু ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক চরবাসী জানান, তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিবাদ করলে হামলা, নির্যাতন এবং ফসল কেটে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত বাদল হোসেন ভেগু বলেন, এলাকার একটি ঈদগাহ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় নতুন ঈদগাহ নির্মাণের উদ্দেশ্যে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সাবেক ইউপি সদস্য লিয়াকত সরদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মরিচা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য গুহ বলেন, পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বালু ও মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের অভিযান চলমান রয়েছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তবে ভুক্তভোগী চরবাসীর দাবি, আশ্বাস নয়—দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে বালুখেকোদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে পদ্মার ভাঙন থেকে ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রক্ষা করতে হবে।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন