স্টাফ রিপোর্টার: চলমান হামের রুটিন টিকার সংকট এবং এর ফলে সৃষ্ট প্রাদুর্ভাবের পেছনে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।
সংস্থাটি জানিয়েছে, টিকার ঘাটতি মোকাবিলায় ২০২৪ সাল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে অন্তত ১০ বার মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৫ থেকে ৬টি আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হয়েছিল। তবে সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ না হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইউনিসেফ কার্যালয়ে ‘হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি ও চলমান প্রতিরোধ কার্যক্রম’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে বছরে হামের টিকার চাহিদা প্রায় ৭ কোটি ডোজ, যার জন্য প্রয়োজন আনুমানিক ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে সংকট মোকাবিলায় ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ইউনিসেফের বিশেষ ‘প্রি-ফাইন্যান্সিং’ ব্যবস্থায় ১৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ১ কোটি ৭৮ লাখ টিকা দেশে আনা হয়, যা মোট চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।
ইউনিসেফ জানায়, দীর্ঘ সময় রুটিন টিকা না পাওয়ায় দেশের বিপুলসংখ্যক শিশু টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যায়, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের হামের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টি করে।
টিকা সংকটের কারণ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, টিকা কেনায় উন্মুক্ত দরপত্রের সিদ্ধান্তই সংকটের অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, আমার মনে হয় না, এর আগে টিকার মতো বিশেষায়িত পণ্যের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, আমরা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ-ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছি। জরুরি বৈঠকের জন্য বারবার অনুরোধ করেছি এবং উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তত ১০ বার বৈঠক করেছি। আমরা স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছিলাম যে, দেশ বড় ধরনের টিকা সংকটের দিকে যাচ্ছে।
টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ পণ্যের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র কার্যকর হলেও টিকার মতো বিশেষায়িত পণ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত ও কার্যকর টিকা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, ইউনিসেফ বিশ্বজুড়ে সরাসরি প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টিকা সংগ্রহ করে বলে কম দামে মানসম্মত টিকা সরবরাহ সম্ভব হয়। তার মতে, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইউনিসেফের চেয়ে কম দামে টিকা পাওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় একটি ‘আফটার অ্যাকশন রিভিউ’ বা পরবর্তী মূল্যায়ন জরুরি। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ শিশু কোনো না কোনোভাবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চলতি মে মাসে দেশে হামের রুটিন টিকা পৌঁছেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি নিশ্চিত করা।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, এখন কাউকে দোষারোপ করার সময় নয়। আমাদের এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিশু প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা না যায়। হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদানে কোনো বিঘ্ন ঘটানো উচিত নয়।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি