স্টাফ রিপোর্টার: ২০১৬ সালে রাজধানীর সড়ক থেকে অলিতেগলিতে বৃষ্টির পানির সঙ্গে কোরবানির পশুর রক্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। ফলে নগরজুড়ে দেখা দিয়েছিল ‘রক্তবন্যা’। নগরবাসীর চরম ভোগান্তির পাশাপাশি শহরের পরিবেশ দূষণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুকিঁ তৈরি হয়েছিল সেই সময়।
গত কয়েকদিনও বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়া এবং ঈদের দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় দশ বছর পর নগরবাসীর মনে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি আবারো তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন বলছে, অতীতে কোরবানিতে ‘রক্তবন্যা’ দেখা গেলেও তাদের যে পরিকল্পনা তাতে এবার সেই রকম পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘আমরা আরও এবার বৃষ্টি চাচ্ছি। কোরবানির পর বৃষ্টি হলে প্রাকৃতিকভাবে রক্তসহ সব কিছু ধুয়ে নিয়ে যাবে। এতে শহর পরিষ্কার হয়ে উঠবে। তবে এবার বৃষ্টিতে রক্তবন্যা হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। আমি চ্যালেঞ্জ করছি, এবার রক্তবন্যার মতো কিছু হবে না।’
রাজধানীতে গত কয়েকদিন ধরে হালকা থেকে মাঝারি কিংবা কখনো বা ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে গত সোমবার ও মঙ্গলবার শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বুধবার (২৭ মে) সকালেও বৃষ্টিতে অলিগলিতে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঈদুল আজহার দিনও ঢাকায় বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। ফলে এক দশক আগের মতো ঈদের দিন ‘রক্তবন্যার’ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে নগরবাসীর মধ্যে একধরনের ভয়ও কাজ করছে।
শান্তিনগর মোড় থেকে পুরো বেইলি রোড গত মঙ্গলবার পানিতে ডুবে গিয়েছিল। অন্যান্য এলাকার পাশাপাশি ২০১৬ সালে ঈদুল আজহার দিন এই এলাকায় ‘রক্তবন্যা’ দেখা গিয়েছিল। এতে ভুগেছিলেন শান্তিনগর মোড় এলাকার বাসিন্দা আসাদুজ্জামান তপন।
কথা হলে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আধ ঘণ্টার বৃষ্টিতেই এই এলাকার যে পরিস্থিতি হচ্ছে তাতে ঈদের দিন কী হবে তা নিয়ে চিন্তায় আছি। সেই পরিস্থিতি (রক্তবন্যা) হলে অবস্থা খুব কঠিন হয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেই বার (২০১৬) এই এলাকায় বেশ কয়েকদিন চলাচল করতে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। রক্ত পানির সঙ্গে মিশে গিয়ে ব্যাপক দূষণ তৈরি হয়েছিল, এতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই কথা মনে হলে এখনও আঁতকে উঠি। এবার যেন তেমন পরিস্থিতি না হয়, সেই প্রার্থনা করি।’
কোরবানির পশু জবাই ও বৃষ্টির পানি জমে রাস্তা বা ড্রেনে দূষণ তৈরি হয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টির বিষয়ে সর্তক করেছেন বিশেষজ্ঞরাও।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘রক্ত পানিতে মিশে যখন পচন ধরে; সেখানে জীবাণু জন্ম নেয়। এতে পানিবাহিত রোগ যেমন: টাইফয়েড, জন্ডিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই কোরবানির পশুর রক্ত যেন কোনোভাবেই দূষণ তৈরি না করতে পারে, সেই ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।’
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আসলে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে। দায়িত্বের হাতবদলেও জলাবদ্ধতার কোনো সমাধান হচ্ছে না। তাই বৃষ্টি হলেই ভোগান্তির আশঙ্কা থাকছেই।’
‘রক্তবন্যার’ শঙ্কায় দক্ষিণের ৩৩ এলাকা, উত্তরের ১০৮
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার জলাবদ্ধতার জন্য ৩৩টি হটস্পট রয়েছে। এরমধ্যে মতিঝিল ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত অঞ্চল-২ এ রয়েছে ১৩টি স্থান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— পশ্চিম মালিবাগ সম্পূর্ণ, খিলগাঁও ফ্লাইওভার থেকে মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টার, আনন্দ বেকারি, মানিকনগর টিটিপাড়া পাম্পের সামনে, টিটিপাড়া ট্রাক স্ট্যান্ড, মুগদা মেডিকেলের সামনে, গুদারাঘাট নৌকাপাড়ের সামনে, গোপীবাগ বড় মসজিদের সামনে, চানমারি মোড় (শাহজাহানপুর মোড়)। পাশাপাশি কমলাপুর রেলস্টেশনের বিপরীতে সামিয়া হোটেলের সামনে, শাপলা চত্বরের উত্তর-পূর্ব পাশে ফুটওভার ব্রিজের নিচে, নটরডেম কলেজের সম্মুখে, সবুজকানন ১ম, ২য় ও ৩য় গলি, মালিবাগ ১ম লেন ও শান্তিবাগ ১৭ নম্বর গলি, শান্তিনগর (হক বেকারির সামনে)।
এ ছাড়া ডিএসসিসির অন্যান্য অঞ্চলের ধানমন্ডি ২৭ (রাপা প্লাজা), গ্রিন রোড (রূপায়ণ টাওয়ার), নিউ মার্কেট (হকার্স মার্কেট ও সাইকেল স্ট্যান্ড), নায়েম গলি (ঢাকা কলেজের পাশে), ইস্কাটন গার্ডেন রোড (নেভি কলোনি), পলাশী (এসএম হলের সামনে), পিজি হাসপাতালের সামনে (সাকুরা হোটেলের নিকটবর্তী), ঢাবি মোকাররম ভবনের সামনে (ওয়াসা অফিস সংলগ্ন), পল্টন, দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সামনে, বোর্ড অফিস ও বুয়েট কোয়ার্টার, ঘোষপট্টি ও আগা সাদেক রোডটিও (বাংলাদেশ মাঠ সংলগ্ন) জলাবদ্ধতার জন্য চিহ্নিত করেছে ডিএসসিসি। অবশ্য ভারী বৃষ্টি হলে অন্যান্য প্রায় এলাকাগুলোতেই জলাবদ্ধতা ও জলজট দেখা দিচ্ছে। ফলে ঈদের দিন কোরবানির পর অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে এসব এলাকায় ‘রক্তবন্যার’ শঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জলাবদ্ধতাপ্রবণ ১০৮ স্থান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরমধ্যে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গাবতলী, উত্তরা, বাড্ডা, ভাটারাসহ বিভিন্ন এলাকা রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে কোরবানির পর ভারী বৃষ্টি হলে ওই সব স্থানে ‘রক্তবন্যার’ আশঙ্কা থাকছে।
তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, কোরবানিকে ঘিরে জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্থানগুলো নিয়ে তাদের আলাদা ভাবনা রয়েছে। এজন্য প্রস্তুতিও সেরে রেখেছেন তারা।
ডিএসসিসি প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘আামদের কোন কোন স্থানে জলাবদ্ধতা হয়, সে ব্যাপারে আমরা অবগত। পাশাপাশি বিগত দিনে এসব এলাকার পানি নিষ্কাশন করার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। ফলে কোরবানির পর যদি ভারী বৃষ্টি হয় তাৎক্ষণিকভাবে তা নিরসন করতে আমরা সক্ষম।’
ব্যাপক প্রস্তুতি দুই সিটির
এবার রাজধানীতে ৯ লাখের মতো পশু কোরবানি হতে পারে। এতে প্রায় ৫৫ হাজার টন বর্জ্য সৃষ্টি হতে পারে। এরমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেন (ডিএসসিসি) এলাকায় মোট ৩৩ হাজার ৯৪২ টন বর্জ্য উৎপাদন হতে পারে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় মোট ২০ হাজার ৮৮৯ টন বর্জ্য তৈরি হতে পারে।
দুই সিটির তথ্যানুযায়ী, এসব বর্জ্য অপসারণে মোট ২৯ হাজার ৫০০ জনবল নিয়োজিত রাখা হবে। এরমধ্যে ডিএসসিসিতে মোট ১৩ হাজার ৪৫৩ জন ও ডিএনসিসিতে ১৬ হাজার জনবল মাঠে থাকবে। এ বিশাল কর্মযজ্ঞে ট্রাক, কম্প্যাক্টর, কন্টেইনার ক্যারিয়ার, পে-লোডার, ডোজার প্রভৃতি মিলিয়ে ডিএসসিসিতে প্রায় ২,১১৭টি ও ডিএনসিসিতে ৭৫২টি যান ও যন্ত্রপাতি নিয়োজিত থাকবে।
সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে বিপুল পরিমাণ বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ডিএসসিসিতেই ১ লাখ ৪০ হাজার বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ বিতরণ করা হয়। আর ডিএনসিসি এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে ১৬ লাখ ৩০ হাজার বিশেষ এই পলিব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি দূষণ রোধে দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ব্লিচিং পাউডার ও স্যাভলন বিতরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডে ৪৬ টন ব্লিচিং পাউডার, ২১০ গ্যালন অর্থাৎ ১০৫০ লিটার স্যাভলন বিতরণ করা হয়েছে। আর ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ডে ৩ হাজার ৬০০ বস্তা ব্লিচিং পাউডার, ১ হাজার ৩৪৮ ক্যান ফিনাইল এবং ৩ হাজার ৯০০ ক্যান স্যাভলন ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ ছাড়া দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এলাকাভিত্তিক কোরবানির পশু জবাইয়ের স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ সিটিতে ৩৫৭টি স্থান নির্ধারণ করেছে। তবে উত্তর সিটিতে কতটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে তা জানা যায়নি।
তাছাড়া সুষ্ঠুভাবে কোরবানি বর্জ্য অপসারণের জন্য দুই সিটি করপোরেশনই হটলাইন চালু করেছে। ডিএসসিসির নাগরিক অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ০১৭০৯৯০০৮৮৮ ও ০২২২৩৩৮৬০১৪ নাম্বার সার্বক্ষণিক চালু থাকবে।
দ্রুত সময়ে সব বর্জ্য অপসারণের প্রতিশ্রুতি প্রশাসকদের
কোরবানি বর্জ্যে ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক প্রেসব্রিফিংয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, ‘ঈদের দিন কলাবাগান এসটিএস থেকে দুপুর দেড়টায় এসটিএস থেকে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে কোরবানির বর্জ্য পরিবহন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হবে। পরবর্তী ৮ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ রাত সাড়ে ৯টার মধ্যে ঈদের প্রথম দিনের বর্জ্য অপসারণ করা হবে।’
নগরবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা নির্ধারিত স্থানে কোরবানি করুন। কোরবানি পশুর বর্জ্য ব্যাগে ভরে নির্দিষ্ট স্থানে রাখুন, যেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সহজে সংগ্রহ করতে পারে। কোরবানিকৃত স্থান পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ব্লিচিং পাওডার ও স্যাভলন জাতীয় জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দিন। মনে রাখবেন, ড্রেন বা নর্দমায় বা যত্রতত্র পশুর বর্জ্য ফেললে রোগ-জীবাণু ছড়ানোর পাশাপাশি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি সবার সহযোগিতায় আমরা একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত ও সুন্দর ঈদ নগরবাসীকে উপহার দিতে সক্ষম হব।’
অন্যদিকে ঈদের দিনের কোরবানি বর্জ্য ১২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণের ঘোষণা দিয়েছেন ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের আগেই কোরবানির বর্জ্য অপসারণে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নতুন সংযোগ সড়ক, প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিজিটাল ওয়েব্রিজের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম ট্রিপ মনিটরিং চালু রাখা হয়েছে।’
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব