স্টাফ রিপোর্টার: পুরান ঢাকার পোস্তায় এবার কাঁচা চামড়ার আমদানি তুলনামূলক কম। অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত দাম না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও আড়তদারেরা। তাদের অভিযোগ, লবণ, কেমিকেল, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় বেড়ে গেলেও চামড়ার দাম গত বছরের মতোই রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দুপুরে লালবাগের পোস্তা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিকেল ৩টার পর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে কোরবানির পশুর চামড়া আসতে শুরু করে। শায়েস্তা খান সড়ক, রাজ নারায়ণ ধর রোডসহ আশপাশের এলাকায় আড়তদারদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া সংগ্রহ করছেন। তবে কোরবানি পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় তখনও পুরোদমে শুরু হয়নি কেনাবেচা। ব্যবসায়ীরা জানান, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেচাকেনা আরও জমে উঠবে।
পোস্তায় আড়তদাররা দুপুরের পর থেকেই চামড়া কেনা শুরু করেছেন, যা চলবে প্রায় এক মাস। সেখানে বড় আকারের কাঁচা চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায়, মাঝারি চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় এবং ছোট চামড়া ১৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। কিছু ব্যবসায়ী অবশ্য গড়ে ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকায় চামড়া কিনেছেন।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংগ্রহ করা চামড়াগুলো প্রথমে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হবে। পরে সেগুলো সাভারের ট্যানারিগুলোতে পাঠানো হবে। তাদের আশঙ্কা, গতবারের মতো এবারও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চামড়া সংগ্রহ হবে না।
প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ২০১৩ সালে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম সর্বোচ্চ ছিল। তখন প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। এরপর বিভিন্ন কারণে চামড়ার দাম ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০১৯ সালে চামড়ার বাজারে বড় ধস নামে। ন্যায্য দাম না পেয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চামড়া ফেলে দেওয়া ও মাটিতে পুঁতে রাখার ঘটনাও ঘটে। এতে প্রায় ২৪২ কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়।
এ বছর ঢাকার ভেতরে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাধারণত বড় গরুর চামড়া ৩১ থেকে ৪৫ বর্গফুট, মাঝারি চামড়া ২১ থেকে ৩০ বর্গফুট এবং ছোট চামড়া ১৬ থেকে ২০ বর্গফুট হয়ে থাকে। সেই হিসাবে ঢাকায় ছোট আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা ৯৯২ থেকে ১৩০০ টাকা, মাঝারি চামড়ার দাম ১৩৬৫ থেকে ১৯৫০ টাকা এবং বড় চামড়ার দাম ২০১৫ থেকে ২৯২৫ টাকা। ঢাকার বাইরে ছোট চামড়ার দাম হওয়ার কথা ৯১২ থেকে ১২৪০ টাকা, মাঝারি চামড়ার দাম ১১৯৭ থেকে ১৮৬০ টাকা এবং বড় চামড়ার দাম ১৭৬৭ থেকে ২৭৯০ টাকা।
যাত্রাবাড়ীর একটি মাদ্রাসার শিক্ষক মো. জায়েদ আহমেদ বলেন, “যাত্রাবাড়ী থেকে ১৮০ পিস চামড়া নিয়ে এসেছি। বড় চামড়ার ৬৮০ টাকা রেট দিয়েছে। ছোট চামড়া নিচ্ছে না। গড়ে ৬০০ টাকা পড়বে। অথচ প্রতিটি চামড়া সংগ্রহ, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ২৫০ টাকা খরচ হয়েছে। এভাবে বিক্রি করলে মাদ্রাসা চালানো কঠিন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা কোনো লবণ পাইনি, প্রশিক্ষণও পাইনি। প্রশিক্ষণ পেলে কয়েকদিন সংরক্ষণ করে পরে হেমায়েতপুরে নিতে পারতাম।”
আগামাসি লেনের দাওয়াতুল কুরআন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক মো. জুনায়েদ বলেন, “সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুরে ১৫০ পিস চামড়া সংগ্রহ করেছি। গড়ে ৭০০ টাকা করে রেট দিয়েছে। কিন্তু পরে ছোট চামড়াগুলো আলাদা করে বাদ দিচ্ছে। ২০-২৫টি চামড়ার দামই দেবে না। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।”
কামরাঙ্গীরচর থেকে ৩০০ চামড়া নিয়ে আসা মো. আব্দুল গাফ্ফার বলেন, “সব মিলিয়ে গড়ে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। এখন বিক্রি না করলে সন্ধ্যার পর দাম আরও কমে যেত। লোকসান হলেও কিছু টাকা তো পেলাম।”
ডেমরার দারুল উলূম মহিউস সুন্নাহ মহিলা মাদ্রাসার মাওলানা নূরউদ্দিন আহমেদ বলেন, “১৮০টি চামড়া নিয়ে এসেছি। গড়ে ৬৫০ টাকা করে দাম দিয়েছে। অথচ পরিবহন, শ্রমিক ও সংগ্রহ খরচ মিলিয়ে গড়ে ৬০০ টাকা পড়ে গেছে। লবণ ও প্রশিক্ষণ পেলে সংরক্ষণ করে পরে বিক্রি করতে পারতাম।”
নারায়ণগঞ্জের মদনপুর থেকে ৩০০ চামড়া নিয়ে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. ওবায়দুল বেপারী বলেন, “৪০ বছর ধরে এই ব্যবসা করি। এবার ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে কিনে এনে ৬৫০ টাকায় বিক্রি করেছি। খরচই ৭০০ টাকা। সরকার দাম বাড়ালেও আমরা সেই দাম পাই না।”
পোস্তার সুমন এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শরিফ বলেন, “সরকার যে দাম নির্ধারণ করে সেটা লবণযুক্ত চামড়ার জন্য। কিন্তু আমরা কিনছি কাঁচা চামড়া। চামড়া কিনে সংরক্ষণ করতে আমাদের বাড়তি প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হয়। পরে ট্যানারিতে ভালো দাম পেলে তবেই লাভ হবে।”
পোস্তায় ৫০ বছর ধরে ব্যবসা করা মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. সিরাজ বলেন, “আগে এখানে ৪০০ আড়ত ছিল, এখন আছে ৬০-৭০টি। কেমিকেল, লবণ, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ অনেক বেড়েছে। সব মিলিয়ে চামড়ার দাম মোটামুটি ঠিকই আছে। ট্যানারি মালিকরা সরকারি রেট দিলে তখন মুনাফা হবে।”
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুরুল হাসান বলেন, “দুপুরের পর থেকে পোস্তায় চামড়া কেনা শুরু হয়েছে। আগের তুলনায় এখন কম চামড়া আসে, কারণ অনেক চামড়া সরাসরি সাভারের হেমায়েতপুরে চলে যায়। চামড়ায় সমস্যা থাকলে দাম কমে যায়। লবণ ও কেমিকেলের দাম বাড়ায় ব্যবসায়ীরাও চাপে আছেন।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে চামড়া ব্যবসায় কোনো সিন্ডিকেট নেই। তবে সিইটিপি সমস্যার কারণে বিদেশি ক্রেতারা প্রভাব বিস্তার করছে।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চামড়া সংরক্ষণ ও নষ্ট হওয়া ঠেকাতে সরকার এবার সারা দেশে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এ জন্য ১৭ কোটির বেশি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়েও আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, যা সম্ভাব্য চাহিদার চেয়ে ২২ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, দেশে বছরে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। এর ৬০ শতাংশের বেশি আসে কোরবানির মৌসুমে। মোট চামড়ার মধ্যে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ গরুর, ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ ছাগলের, ২ দশমিক ২৫ শতাংশ মহিষের এবং ১ দশমিক ২ শতাংশ ভেড়ার চামড়া।
কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম ঈদুল আজহা। সারা বছরে দেশে যত পশু জবাই হয়, তার প্রায় ৬০ শতাংশই হয় এই ঈদে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব