প্রিন্ট এর তারিখঃ | বঙ্গাব্দ || প্রকাশের তারিখঃ 04-06-2026 ইং
সংবাদ শিরোনামঃ বিয়ে পাগল জবেদ আলী ৩ যুগের নিখোঁজ জীবন শেষে ফিরলেন বাড়ি
মেহেরপুর প্রতিনিধি : দুই স্ত্রী ও সন্তান রেখে তৃতীয় বিয়ে করতে না পারার অভিমানে জবেদ আলী ছেড়েছিলেন বাড়ি। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৮ টি বছর। এই দীর্ঘ সময়ে আবারো করেছেন বিয়ে, গড়েছেন নতুন সংসার, কিনেছেন জমি-জমাও। আর এদিকে জন্মভূমিতে থাকা প্রথম স্ত্রী দিনমজুরি আর মানুষের বাড়িতে কাজ করে বড় করেছেন একমাত্র সন্তানকে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আবার সেই পুরোনো ঠিকানায় ফিরেছেন জবেদ আলী। কিন্তু যে ঘর ছেড়ে গিয়েছিলেন, সেই ঘরই এখন তার জন্য বন্ধ। স্ত্রী বলছেন, ৩৮ বছরের ভরণপোষণের হিসাব না মিটিয়ে তাকে স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে মৃত দেখিয়ে বণ্টননামার মাধ্যমে তার সম্পত্তিও নিজেদের নামে লিখে নিয়েছেন স্বজনরা। ফলে ফিরে এসে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।
জাবেদ আলী ৩৮ বছর নিরুদ্দেশ থাকার পর গত সোমবার (১ জুন) মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দী বাজারের ক্যাম্পপাড়া এলাকায় তার নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছেন। জবেদ আলী (৬৬) ওই গ্রামের মৃত তোজাম্মেল হকের ছেলে। নাগরিক প্রতিদিনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বামন্দী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান শাহ আলম।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে জবেদ আলী তার প্রথম স্ত্রী রুশিয়া খাতুন ও ৫ বছর বয়সী ছেলে জাহাঙ্গীর আলমকে রেখে আবারো বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রী তার বাবার বাড়িতে চলে যান। এর কিছুদিন পর জাবেদ আলী তৃতীয় বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে বাধা দেন তার বাবা-মা ভাই এবং দ্বিতীয় স্ত্রী সহ পরিবারের সদস্যরা। একপর্যায়ে রাগ ও ক্ষোভ বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হন জাবেদ আলী।
প্রতিবেশীদের অনেকেই ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও তারা জানান, প্রথম স্ত্রী ও সন্তান থাকা অবস্থায় জবেদ আলী দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রুশিয়া খাতুন সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। এর কিছুদিন পর জবেদ আলী পরিবারের সদস্যদের কাছে তৃতীয় বিয়ে করার ইচ্ছার কথা জানান। এতে বাবা-মা ও ভাইয়েরা তাকে তীব্রভাবে বকাবকি করেন। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের ওপর অভিমান করে তিনি বাড়ি ছেড়ে অজানার উদ্দেশে চলে যান।
এরপর দীর্ঘ সময় তিনি খুলনা, যশোর, বরিশাল, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে এই সময়ে তিনি আরো দুইটা বিবাহ করেছেন। একপর্যায়ে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার কুন্ডুরিয়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন এবং আরেকটি সংসার গড়ে তোলেন। ওই সংসারে তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
জবেদ আলী জানান, কয়েক বছর আগে তার সর্বশেষ স্ত্রী মারা যান। বর্তমানে তার মেয়ের বয়স ১১ বছর। স্ত্রীর মৃত্যুর পর জীবনের শেষ সময়টা স্বজনদের সঙ্গে কাটানোর আশায় তিনি জন্মভূমিতে ফিরে এসেছেন।
কিন্তু ফিরে এসে তিনি দেখতে পান, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকায় স্বজনরা তাকে মৃত ধরে নিয়েছেন। পারিবারিক সূত্রে পাওয়া তার অংশের জমিজমা বণ্টননামার মাধ্যমে প্রথম স্ত্রী ও সন্তান নিজেদের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন। এমনকি কিছু সম্পত্তি বিক্রিও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, প্রথম দিন আবেগাপ্লুত হয়ে স্বামীকে গ্রহণ করলেও পরে অবস্থান বদলান রুশিয়া খাতুন। বর্তমানে তিনি স্বামীকে ঘরে তুলতে রাজি নন।
রুশিয়া খাতুন বলেন, 'ওর ফিরে আসা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। ৩৮ বছর সন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে ভেসেছি। তখন কি একবারও তার মনে হয়েছে ঘরে থাকা শিশুটি কী খাচ্ছে, কীভাবে বেঁচে আছে? মানুষের বাড়িতে এমন কোনো কাজ নেই, যা আমি করিনি। বুকের সন্তানকে মানুষ করতে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছি।'
তিনি আরো বলেন, 'এখন সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে। ছেলে কুয়েতে থাকে। এত বছর পর ফিরে এসে আবার সংসার করতে চাইলে আগে ৩৮ বছরের ভরণপোষণের হিসাব দিতে হবে।'
রুশিয়া জানান, স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে আর্থিক সংকটে পড়ে কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন কাটান। একমাত্র ছেলে জাহাঙ্গীর বড় হয়ে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করে সংসারের হাল ধরে। বর্তমানে তিনি কুয়েতপ্রবাসী। ছেলে দেশে ফিরলে তার মতামত অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমানে জবেদ আলী নিজের ঘরে উঠতে না পেরে তার ভাইদের বাড়িতে অবস্থান করছেন।
জবেদ আলীর ভাই ও ভাতিজারা জানান, দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পাওয়ায় প্রায় তিন বছর আগে তারা ধরে নিয়েছিলেন তিনি আর বেঁচে নেই। এরপর তার সন্ধান করা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে এখন তারা আশা করছেন, পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে স্ত্রী ও ছেলে তাকে মেনে নেবেন এবং দীর্ঘদিনের দূরত্ব ও অভিমান একসময় কেটে যাবে।
জবেদ আলী বলেন, 'পরিবার ও স্বজনরা যদি আমাকে মেনে নেয়, তাহলে আমার ছোট মেয়েকেও এখানে নিয়ে আসব।'
কী কারণে তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন? এমন প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টিকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক উল্লেখ করে এড়িয়ে যান।
তবে জবেদ আলীর স্বজনরা জানিয়েছেন, তার অপর সংসারের কন্যা সন্তানটিকেও তারা পরিবারের সদস্য হিসেবেই দেখছেন। তাকে নিজেদের সন্তানের মতো লেখাপড়া করিয়ে বড় করার ইচ্ছা রয়েছে তাদের।
দীর্ঘ ৩৮ বছর পর জবেদ আলীর ফিরে আসার ঘটনা ঘিরে বামন্দী এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কারও কাছে এটি হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষের ফিরে আসার আবেগঘন গল্প, আবার কারও কাছে এটি দায়িত্ব, সম্পর্ক ও সময়ের নির্মম হিসাবের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।