ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দেশ চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। প্রাথমিক এই চুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে, যদিও তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
এটি এখনো একটি কাঠামোগত সমঝোতা হলেও, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া সংঘাতের অবসানের পথে এটিকে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই যুদ্ধে হাজারো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
রোববার ওয়াশিংটন সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন হয়েছে।” এর কিছুক্ষণ আগে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, স্থানীয় সময় সোমবার ভোরে একটি সমঝোতা অর্জিত হয়েছে।
সমঝোতা স্মারকটি আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে।
চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্ত তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে শাহবাজ শরিফ এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, এতে “লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধের” কথা বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যাওয়ায় লেবানন ইস্যু আলোচনার অন্যতম জটিল বিষয় হয়ে উঠেছিল। ট্রাম্পসহ বিভিন্ন পক্ষের আহ্বান সত্ত্বেও তারা হামলা বন্ধ করেনি।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবালয় এক বিবৃতিতে জানায়, সোমবার রাত থেকে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে।
তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, সীমান্ত ও বসতি রক্ষার স্বার্থে লেবানন, সিরিয়া ও গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী অনির্দিষ্টকাল অবস্থান করবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তিনি নিজে এ অবস্থান ট্রাম্প ও অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে স্পষ্ট করেছেন।
কাটজ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “লেবাননের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরান যদি ইসরায়েলে হামলা চালায়, তাহলে আমরা সর্বশক্তি দিয়ে জবাব দেব এবং শক্তির পার্থক্য স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেব।”
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় আরও বিস্তৃত একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ও থাকবে।
রয়টার্সকে আগে দেওয়া সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়েও ওই পরবর্তী আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পুনরায় খুলছে হরমুজ প্রণালি
ট্রাম্প জানিয়েছেন, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালি শুক্রবার থেকে পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। কয়েক মাস ধরে ইরান কার্যত এ পথ বন্ধ রেখেছিল। একই সঙ্গে তিনি ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন।
ট্রাম্প লেখেন, “বিশ্বের জাহাজগুলো, ইঞ্জিন চালু করো। তেল প্রবাহিত হতে দাও!”এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়। অন্যদিকে এশিয়ার শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়।
আইটিসি মার্কেটসের জ্যেষ্ঠ বৈদেশিক মুদ্রা বিশ্লেষক শন ক্যালো বলেন, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে বিস্তারিত তথ্যের অভাব উদ্বেগের বিষয় হলেও তা আপাতত বাজারকে প্রভাবিত করবে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস চুক্তিটিকে যুদ্ধের ক্ষেত্রে “সম্ভাব্য যুগান্তকারী অগ্রগতি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রভাব, পারমাণবিক বিষয়ে দক্ষতা এবং উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে টেকসই সমাধানে ইইউ ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।
নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছিল। একই সময়ে রিপাবলিকান দলের ভেতর থেকেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি উঠছিল।
রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনা তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।
তিনি বলেন, “আমাদের আইনে ইরানের সঙ্গে যেকোনো পারমাণবিক চুক্তি পর্যালোচনা ও ভোটের জন্য কংগ্রেসে পাঠানো হবে। এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন।”
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০১৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে স্বাক্ষরিত বহুপাক্ষিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। ওই চুক্তির আওতায় পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতার বিনিময়ে তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়িয়ে প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করে, যা বোমা তৈরির উপযোগী মাত্রার কাছাকাছি।
জব্দ করা সম্পদ মুক্তির বিষয়ও আলোচনায়
রোববার লেবাননে ইসরায়েলি হামলার পরও এই সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে, যা ইরান ও ট্রাম্প—উভয় পক্ষের সমালোচনার মুখে পড়ে।
ইরানের দাবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল লেবাননে পূর্ণ যুদ্ধবিরতি। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়ে এসেছে, সেখানে সামরিক অভিযান চালানোর স্বাধীনতা তারা বজায় রাখবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের বিভিন্ন দেশের নেতারাও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালি এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নিলে তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে প্রস্তুত।
চুক্তি ঘোষণার আগে রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, খসড়া সমঝোতা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ২৫ বিলিয়ন ডলারের ইরানি জব্দকৃত সম্পদ ছাড় করতে সম্মত হবে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন আগে বলেছিল, শান্তিচুক্তির শর্ত পূরণের পরই এ ধরনের অর্থ ছাড় করা হবে।
অন্যদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হবে এবং উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করে সরিয়ে নেওয়া হবে।
তবে জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেন, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী ইরান দেশের ভেতরেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে নিম্নমাত্রায় রূপান্তরের সুযোগ পাবে। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে না। রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি