ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহনকারী সৌদি পতাকাবাহী তিনটি সুপারট্যাংকার।
তবে লেবাননে, যেখানে সংঘাতের কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, সেখানে বৃহস্পতিবার সকালে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর ট্রাম্প তাঁর যুদ্ধকালীন মিত্রদের অভিযান থামাতে কতটা চাপ প্রয়োগ করবেন।
বুধবার ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ সমাপ্তির জন্য একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এতে পূর্বনির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই চুক্তি কার্যকর হয়। সমঝোতা অনুযায়ী, অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
যদিও জাহাজ পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করা এবং সমুদ্রে পাতা মাইন অপসারণের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধপূর্ব সময়ের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কিছুটা সময় লাগবে, তবুও ইতোমধ্যে এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
যেসব জাহাজ আগে নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখত, সেগুলো এখন আবার অবস্থান সম্প্রচার করছে এবং প্রণালি অতিক্রমের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম আরও ২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বনিম্ন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা শুরু হয়েছে, যার মধ্যে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে। ট্রাম্প গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন।
লেবানন যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের কথাও উল্লেখ
তবে মার্চ মাসে লেবাননে সামরিক অভিযান শুরু করে দক্ষিণাঞ্চলের বড় অংশ দখল করা ইসরায়েলকে আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা ইরানের সমর্থনে সীমান্তে হামলা শুরু করার পর তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথা বলে এই অভিযান শুরু করেছিল ইসরায়েল।
ইরান বরাবরই বলে এসেছে, যে কোনো শান্তিচুক্তির আওতায় লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ট্রাম্প স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে স্পষ্টভাবে লেবাননের যুদ্ধের "স্থায়ী অবসান" এবং দেশটির "ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব" নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইরানের প্রতি বড় ধরনের ছাড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে লেবাননে ইসরায়েলের অভিযান নিয়ে প্রকাশ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তাঁর অভিযোগ, হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তু করতে গিয়ে ইসরায়েল অপ্রয়োজনীয়ভাবে পুরো ভবন ধ্বংস করছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল জানিয়েছে, ট্রাম্প যা-ই আলোচনা করুন না কেন, তাদের লেবানন থেকে সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত নতুন মানচিত্রে তারা দক্ষিণ লেবাননে সেনা নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল আরও সম্প্রসারণের তথ্য দিয়েছে, যাকে তারা "বাফার জোন" হিসেবে বর্ণনা করছে।
নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি বজায় রাখতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
জ্যেষ্ঠ ওই কর্মকর্তা আলোচনাকে "কঠিন ও অনমনীয়" বলে উল্লেখ করে বলেন, ইসরায়েল পিছু হটবে না। অপর কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগ বা পরিণতির হুমকি দেন কি না, তার ওপরই ফলাফল নির্ভর করবে।
লেবাননে আবারও বেড়েছে হামলা
সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পর লেবাননে সংঘর্ষ কিছুটা কমেছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনে তা আবার বেড়েছে এবং ট্রাম্প চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পরও বৃহস্পতিবার সকালে হামলা অব্যাহত থাকে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের কাফারতেবনিত ও জেবদিন শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। রয়টার্সের সাংবাদিকরা বৈরুত এবং এর দক্ষিণ উপশহরের আকাশে নিচু দিয়ে উড়তে থাকা ইসরায়েলি ড্রোনের শব্দ শুনেছেন।
দক্ষিণাঞ্চলীয় নাবাতিয়েহ শহর থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বৈরুতে আশ্রয় নেওয়া মোহাম্মদ দোগমান বলেন,"ইরান ও আমেরিকার বিষয় শেষ হয়েছে, ভালো কথা। কিন্তু লেবাননে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি।"
তিনি বলেন,"আমাদের স্পষ্ট করে জানানো উচিত—যুদ্ধ কি স্থায়ীভাবে শেষ হয়েছে, নাকি আবারও আমরা সেই পরিস্থিতিতে ফিরে যাব?"
দক্ষিণ লেবাননের টাইর বন্দরের কাছে কালাইলিয়েহ এলাকায় কিছু বাসিন্দা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া নিজেদের বাড়িঘর দেখতে ফিরে এসেছেন। অনেকেই এই দৃশ্যের সঙ্গে গাজার ধ্বংসযজ্ঞের তুলনা করছেন।
টাইরের বাসিন্দা আবদেলকরিম আল-দাহি ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘাতকে জনপ্রিয় কার্টুন 'টম অ্যান্ড জেরি'-র বিড়াল-ইঁদুরের লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করে বলেন,"তারা কখনো থামে না।"
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কে বড় ফাটল?
বহু বছর ধরেই নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলে আসছেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ইসরায়েলের পক্ষে বড় পরিবর্তন আসে এবং শেষ পর্যন্ত চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
কিন্তু লেবানন ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থানের পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের কয়েক দশকের অন্যতম বড় মতপার্থক্যের জন্ম দিয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারক নিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক হতাশা দেখা দিয়েছে।
টাইমস অব ইসরায়েল বৃহস্পতিবার লিখেছে,
"খুব শিগগিরই ইসরায়েলকে হয়তো একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সামরিক চাপ অব্যাহত রেখে ট্রাম্পের কূটনৈতিক সমর্থন হারাবে, নাকি তাঁর সমর্থন ধরে রাখতে গিয়ে দেশটির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত যুদ্ধটি বন্ধ বা সীমিত করবে।"
প্রায় চার মাস আগে যুদ্ধ শুরু করার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া, আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করানো এবং ইরানের জনগণের জন্য কঠোরপন্থী নেতৃত্বকে উৎখাতের সুযোগ সৃষ্টি করা।
যদিও শুরুতে তিনি ইরানের "নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ" দাবি করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত এসব লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই তিনি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, সামনে শুরু হতে যাওয়া আলোচনা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে শক্তিশালী চুক্তির পথ খুলে দিতে পারে এবং প্রয়োজনে ট্রাম্প পুনরায় বোমা হামলার হুমকি দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা ধরে রেখেছেন।
তবে ট্রাম্পের সমালোচকরা, এমনকি তাঁর নিজ দলের কট্টরপন্থী অংশের অনেকে মনে করেন, যুদ্ধের আগের তুলনায় ইরান এখন আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। কারণ, তারা একটি পরাশক্তির হামলা মোকাবিলা করেছে, হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছাড় আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। রয়টার্স
[মায়া গেবেইলি, রামি আইয়ুব ও জোহরা বেনসেমরার প্রতিবেদন]
রিপোর্টার্স২৪/এসসি