ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ইউক্রেন বৃহস্পতিবার রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে চলতি সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো আঘাত হানে মস্কোর প্রধান তেল শোধনাগারে। কিয়েভ বলছে, প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো কিয়েভ পেচেরস্ক লাভরা মঠ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জবাব হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সাংবাদিকদের পাঠানো এক ভয়েস বার্তায় বলেন, আমরা কখনোই এই যুদ্ধ চাইনি এবং সবাই তা জানে, আমাদের মিত্ররাও জানে। কিন্তু যদি ইউক্রেন পুড়ে যায়, তাহলে তোমাদের মস্কোও পুড়বে।
এর জবাবে রাশিয়াও সপ্তাহের দ্বিতীয়বারের মতো কিয়েভে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর আগে কিয়েভের ঐতিহাসিক পেচেরস্ক লাভরা মঠে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দার ঝড় ওঠে, যদিও রাশিয়া ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে।
রয়টার্সের সাংবাদিকরা মস্কোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কাপোতনিয়া এলাকায় আগুন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখতে পান। রাজধানীতে জ্বালানি সরবরাহকারী তেল শোধনাগারটি এই এলাকাতেই অবস্থিত।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানান, কয়েকটি ড্রোন শোধনাগারে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া একটি শপিং সেন্টারও সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ার দাবি, ৫৫৫টি ড্রোন ভূপাতিত
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সারা দেশে মোট ৫৫৫টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মস্কোর আকাশেই ১৮০টি ড্রোন গুলি করে নামানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মেয়র সোবিয়ানিন।রুশ বার্তা সংস্থা তাসের মতে, এটি চলতি বছরের সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলাগুলোর একটি।
জেলেনস্কি হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ইউক্রেনের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলের একটি তেল ডিপো এবং আরও দুটি সেতুতেও হামলা চালিয়েছে, যাতে রুশ বাহিনীর সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়।
চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেন ক্রমেই দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। অন্যদিকে রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে।
কিয়েভের দাবি, উন্নত ড্রোন সক্ষমতার কারণে যুদ্ধের গতি এখন তাদের পক্ষে বদলাতে শুরু করেছে এবং এর ফলে মস্কো শান্তিচুক্তির বিষয়ে আলোচনায় বসতে বাধ্য হতে পারে।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, "আজ সকালে মস্কোর মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—কী হচ্ছে? এর উত্তর সহজ। তোমাদের দেশ আমাদের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের যুদ্ধ শুরু করেছে এবং বছরের পর বছর ধরে আমাদের মানুষকে হত্যা করছে। এখন যখন তোমরা বুঝতে পারছ কী হচ্ছে, তখন পুতিনকে জিজ্ঞেস করো, তিনি কবে এই যুদ্ধ শেষ করবেন।"
হামলায় শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা পিছিয়ে যাচ্ছে: মস্কো
রাশিয়া বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধে পিছিয়ে পড়ছে এবং শান্তি আলোচনা শুরুর আগে কিয়েভকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ ছেড়ে দিতে হবে।
ক্রেমলিনের সহকারী ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলাগুলো প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনাকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার শহর ও জনগণের ওপর হামলার জবাবে এই আঘাত "সম্পূর্ণ ন্যায্য প্রতিক্রিয়া" এবং এটি রুশ যুদ্ধযন্ত্রকে সহায়তাকারী স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় সেনাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, মঙ্গলবারের হামলার পর থেকেই মস্কোর তেল শোধনাগারের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়েছে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক রাশিয়া ইউক্রেনীয় হামলায় একের পর এক শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এ মাসে সমুদ্রপথে পেট্রোল আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে শিল্প খাতের সূত্রগুলো জানিয়েছে।
মস্কো অঞ্চলে একটি বহুতল আবাসিক ভবন, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং কয়েকটি ব্যক্তিগত বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলায় অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় গভর্নর।
সব মস্কো বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখা হয় এবং তেল শোধনাগারের কাছাকাছি মহাসড়কে যান চলাচল স্থগিত করা হয়। রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ত শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরও খালি করা হয়েছে।
অন্যদিকে সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় একটি গাড়িতে থাকা এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। রোস্তভ অঞ্চলে আরেকটি হামলায় একজনের মৃত্যু এবং দুটি বাণিজ্যিক স্থাপনায় আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে ইউক্রেনের অধিকাংশ এলাকায় বিমান হামলার সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং রাজধানী কিয়েভে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তাকাচেঙ্কো জানিয়েছেন, রাশিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাজধানীতে হামলা চালাচ্ছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুমি শহরে রাতভর ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দিনিপ্রো শহরে রুশ হামলায় একজন নিহত এবং আরও ১১ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় গভর্নর জানিয়েছেন।রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি