তাওহীদাহ্ রহমান নূভ: গতকাল ছিলো ২১ জুন, বিশ্ব ইয়োগা দিবস। প্রতিদিনের চেনা ইঁদুরদৌড়, অফিসের ডেডলাইন, আর নাগরিক কোলাহলের মাঝে আজ বিশ্বজুড়ে একটা মুহূর্তে জন্য হলেও থামবেন কোটি কোটি মানুষ। বুক ভরে একটুখানি শ্বাস নেবেন, শরীরটাকে টানটান করে খুঁজবেন অন্তরের শান্তি। ২০১৪ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে প্রতি বছর এই দিনটিতে বিশ্বজুড়ে সাড়ম্বরে পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আধুনিক এই ব্যস্ত জীবনে ইয়োগা বা যোগব্যায়াম আমাদের জন্য ঠিক কতটা জরুরি?
উৎপত্তি: প্রাচীন প্রজ্ঞা থেকে আধুনিক ম্যাট
ইয়োগার ইতিহাস আজ বা কালকের নয়। এর উৎপত্তি প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে, ভারতীয় উপমহাদেশে। ‘যোগ’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘যুজ’ ধাতু থেকে, যার অর্থ যুক্ত করা বা একীভূত করা। প্রাচীন ঋষি-মুনিরা শরীর, মন এবং আত্মার মাঝে একাত্মতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে এই দর্শনের চর্চা শুরু করেছিলেন। কালের বিবর্তন পেরিয়ে সেই প্রাচীন বিদ্যা আজ সুসজ্জিত স্টুডিও আর আধুনিক লাইফস্টাইলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
ধর্মীয় দিক: আচার নাকি জীবনদর্শন?
ইয়োগা নিয়ে অনেকের মনেই একটা প্রশ্ন উঁকি দেয়—এটি কি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের আচার? উত্তর হচ্ছে, না। উৎপত্তিগতভাবে প্রাচীন ভারতে সনাতন ধর্মের আবহে এর বিকাশ ঘটলেও, ইয়োগা কোনো ধর্মীয় উপাসনা নয়। এটি মূলত একটি বিজ্ঞানসম্মত জীবনদর্শন ও শরীরচর্চা পদ্ধতি। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে যেকোনো মানুষ নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য ইয়োগা করতে পারেন। এর মূল বাণী হলো—নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া এবং মনকে শান্ত করা।
পারিপার্শ্বিক কাঠামো ও সমাজে এর প্রভাব
একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে ইয়োগার ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজকের দিনে মানুষের সহনশীলতা কমছে, বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। ইয়োগা মানুষের ভেতরের রাগ, ক্ষোভ ও অবসাদ দূর করে সহানুভূতি এবং ধৈর্য বাড়ায়। যখন একটি সমাজের মানুষ মানসিকভাবে শান্ত ও ইতিবাচক থাকে, তখন তার প্রভাব পড়ে পুরো পারিপার্শ্বিক কাঠামোতে। অপরাধপ্রবণতা হ্রাস পায়, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত হয় এবং কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
শরীর ও মনে ইয়োগার জাদুকরী প্রভাব
নিয়মিত ইয়োগা করলে আমাদের শরীরে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে। এটি কেবল মেদ কমায় না, বরং শরীরের প্রতিটি পেশির জড়তা দূর করে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত যোগাভ্যাসে হৃদযন্ত্র সুরক্ষিত থাকে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বহুলাংশে কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় ডেস্কে বসে কাজ করার কারণে পিঠ, কোমর ও ঘাড়ের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় ভোগেন, তাদের জন্য ইয়োগা এক জাদুকরী মহৌষধ। একই সাথে এটি শরীরের ভেতরের টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থ বের করে দিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মনের ওপর এর প্রভাব আরও গভীর। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, ইয়োগা করলে শরীরে 'কর্টিসল' নামক স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ কমে যায়, ফলে মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা দূর হয়।
ইয়োগা করলে মন কেমন থাকে?
সহজ কথায়, ইয়োগা করলে মন থাকে যেন এক শান্ত, স্থির দিঘির মতো। সারাদিনের দুশ্চিন্তা আর অবসাদ মেঘের মতো কেটে যায়। ইয়োগার অন্যতম প্রধান অংশ হলো ‘প্রাণায়াম’ বা শ্বাসের ব্যায়াম। যখন আমরা গভীর শ্বাস নিই, তখন মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ে। ফলে মন তাৎক্ষণিকভাবে শান্ত হয়, মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে এবং রাতে চমৎকার ঘুম হয়। রাগ, ক্ষোভ বা হতাশার মুহূর্তে মাত্র ১০ মিনিটের যোগব্যায়াম মনকে একদম ফুরফুরে ও ইতিবাচক করে তুলতে পারে।
কীভাবে শুরু করবেন? (নতুনদের জন্য সহজ পাঠ)
ইয়োগা শুরু করার জন্য আপনাকে সার্কাসের মতো কঠিন কোনো অঙ্গভঙ্গি করতে হবে না। খুব সহজ কিছু নিয়ম মেনে ঘরে বসেই শুরু করতে পারেন:
উপযুক্ত সময়: সকালবেলা ইয়োগা করার সবচেয়ে সেরা সময়। তবে বিকেলে বা সন্ধ্যায়ও করা যায়, শর্ত একটাই—পেট খালি থাকতে হবে (খাওয়ার অন্তত ৩-৪ ঘণ্টা পর)।
পরিবেশ ও পোশাক: ঘরে বা বারান্দায় যেখানে আলো-বাতাস চলাচল করে, এমন শান্ত জায়গা বেছে নিন। সুতি ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন। একটি ভালো ইয়োগা ম্যাট ব্যবহার করুন।
সহজ কিছু আসন: শুরুতেই কঠিন আসনে না গিয়ে 'তাড়াসন' (সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শরীর ওপরে টানা), 'বৃক্ষাসন' (এক পায়ে দাঁড়িয়ে হাত ওপরে তোলা), বা 'শবাসন' (চিত হয়ে শুয়ে শরীর শিথিল করা) দিয়ে শুরু করুন।
শ্বাসের দিকে নজর: ইয়োগার আসল রহস্য লুকিয়ে আছে শ্বাসে। আসন করার সময় জোর করে শ্বাস ধরে রাখবেন না। স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন এবং ছাড়ুন।
ইয়োগা কোনো একদিনের হুজুগ বা অলৌকিক ম্যাজিক নয়; এটি একটি অভ্যাস, একটি জীবনধারা। প্রতিদিন মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট নিজের জন্য বরাদ্দ রাখুন। সুস্থ দেহে সুন্দর মন নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু হতে পারে না। এই বিশ্ব ইয়োগা দিবস থেকে আমাদের অঙ্গীকার হোক—শরীর ও মনের যত্ন নেব, সুস্থ-সুন্দর জীবন গড়ব।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব