স্টাফ রিপোর্টার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১-২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করেছেন। সফরকালে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে দুদেশ ৩৩ দফা যৌথ বিবৃতিও প্রকাশ করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ইস্যুতে অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির লক্ষ্যে নতুন করে যৌথ কার্যনির্বাহী গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে সম্মত হয়েছে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে পাশে থাকবে মালয়েশিয়া। দুদেশের প্রধানমন্ত্রী আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছেন। এ ছাড়া জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে উভয় দেশ।
সমঝোতা-দলিল বিনিময়
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সম্পর্ক বাড়াতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক দলিল বিনিময় করা হয়েছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার ক্ষেত্রে গবেষণা ও সক্ষমতা বাড়াতে দুদেশ যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে আরও একটি দলিলি বিনিময় হয়েছে।
শ্রমবাজার উম্মুক্তের লক্ষ্যে নতুন সমঝোতা
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের অব্যাহত, নিরাপদ এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক অভিবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উভয় দেশ যৌথ কার্যনির্বাহী গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠন করতে সম্মত হয়েছে। এই কমিটির মূল লক্ষ্য হবে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) মূল্যায়ন করা এবং উভয় দেশের বর্তমান চাহিদা পূরণ করে এমন একটি নতুন ও হালনাগাদকৃত এমওইউ-এর খসড়া তৈরির ভিত্তি স্থাপন করা।
মালয়েশিয়া কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত বাংলাদেশের প্রস্তাবকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ সংক্রান্ত মালয়েশিয়ার বর্তমান নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে উভয় পক্ষ স্বীকার করেছে যে, নতুন বিদেশি কর্মী কোটার অনুমোদন বর্তমানে নিয়োগকর্তার যাচাইকৃত চাহিদা এবং খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ সীমার ওপর নির্ভর করে কঠোরভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। এই ধরনের যে কোনো অনুমোদিত কোটার জন্য, উভয় দেশ শুধুমাত্র বিশ্বাসযোগ্য ও যোগ্যতাসম্পন্ন নিয়োগকারী সংস্থা ব্যবহার করে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, ন্যায্য, বৈষম্যহীন এবং প্রতিযোগিতামূলক করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
২০২৭ সালের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি
মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরুর দিকে অর্জিত অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছে। উভয় পক্ষই ২০২৭ সালের মধ্যে একটি পারস্পরিকভাবে লাভজনক ও দূরদর্শী চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য রীতির প্রতিফলন ঘটাবে।
উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে যে, উচ্চ-পর্যায়ের সফরসহ নিয়মিত সংলাপ ও আদান-প্রদান শ্রম সহযোগিতাসহ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয়কে শক্তিশালী করেছে। তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বিষয়ে সম্পৃক্ততা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
নেতারা বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়মিত সংলাপের গুরুত্ব স্বীকার করেন এবং এ প্রসঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত যৌথ কমিশন বৈঠক (জেসিএম) এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনা (বিসি) পুনরায় শুরু করতে সম্মত হন।
উভয় নেতা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের তাৎপর্য স্বীকার করেন এবং উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। নেতারা অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজতর করতে তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে পাশে থাকবে মালয়েশিয়া
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মালয়েশিয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে এবং বাংলাদেশের প্রতি তার সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। মালয়েশিয়া মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান অর্জনের লক্ষ্যে পরিচালিত প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বাংলাদেশ আসিয়ান, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), জাতিসংঘ এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক ফোরামসহ দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মালয়েশিয়ার অব্যাহত সমর্থন এবং নীতিগত প্রতিনিধিত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসিয়ান সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার মর্যাদা অর্জনের মাধ্যমে আসিয়ানের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের এই আগ্রহকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং আসিয়ান কাঠামোর মধ্যে ঢাকার আকাঙ্ক্ষাকে গঠনমূলকভাবে সমর্থন করার জন্য মালয়েশিয়ার প্রস্তুতির কথা প্রকাশ করেছেন।
মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে এই অঞ্চলে আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব (আরসিইপি)-এর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও কৌশলগত ভূমিকা স্বীকার করে বাংলাদেশের এই সংস্থায় যোগদানের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করা হয়েছে। উভয় নেতা উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীকরণ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশ পক্ষ মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং চুক্তিতে যোগদানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। এ লক্ষ্যে দুদেশ দ্বিপাক্ষিক যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কমিটি (জেসিডিসি) গঠন করবে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত উচ্চ-পর্যায়ের সামরিক সফর, কর্মী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং শুভেচ্ছামূলক নৌ-বন্দর পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে চমৎকার ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের প্রশংসা করেছেন। উভয় নেতা সামরিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্প অংশীদারিত্বে কৌশলগত সহযোগিতা প্রসারিত করার জন্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারকটি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। তারা একটি কাঠামোগত প্রতিরক্ষা রোডম্যাপ প্রণয়নের জন্য দ্বিপাক্ষিক যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কমিটি (জেসিডিসি) গঠনের প্রত্যাশা করছেন।
জ্বালানি সহযোগিতা
বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। উভয় পক্ষ দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা জোরদার করার গুরুত্ব স্বীকার করেছে। উভয় পক্ষ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামো, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং এর অবকাঠামোর ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে, যা পেট্রোনাস এবং পেট্রোবাংলার মধ্যে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক এলএনজি আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে।
বাংলাদেশ পক্ষ মালয়েশীয় কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা, চুনাপাথরের মতো অনাবিষ্কৃত খনিজ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর। উভয় পক্ষ সংশ্লিষ্ট জাতীয় জ্বালানি কোম্পানি এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতাকে উৎসাহিত করেছে, যাতে উভয় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখে এমন দীর্ঘমেয়াদী, পারস্পরিকভাবে লাভজনক অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নেওয়া যায়।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব