স্পোর্টস ডেস্ক: ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন। আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশের রোজারিও শহরে জন্ম নিয়েছিলেন এক শিশু, যিনি একসময় হয়ে উঠবেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। মা-বাবার তৃতীয় সন্তান সেই লিওনেল মেসি আজ ৩৯তম জন্মদিনে পা রেখেছেন। তবে ক্যারিয়ারের শেষপ্রান্তে এসেও তিনি যেন আরও বেশি দুর্দান্ত, আরও বেশি ক্ষুধার্ত।
যেখানে অধিকাংশ কিংবদন্তি বয়সের ভারে অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হন, সেখানে ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি যেন নতুন করে লিখছেন ইতিহাস। দুই ম্যাচে পাঁচ গোল করে শুধু আর্জেন্টিনাকে নকআউট পর্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেননি, নিজের নামের পাশে যোগ করেছেন একের পর এক রেকর্ডও।
নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে ফুটবলের হাতেখড়ি। এরপর বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি লা মাসিয়ায় যোগ দেওয়া। শৈশবে গ্রোথ হরমোনজনিত সমস্যার সঙ্গে লড়াই, ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং অসংখ্য প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজকের লিওনেল মেসি শুধু বিশ্বের সেরা ফুটবলারই নন, অনেকের চোখে তিনি সর্বকালের সেরাও।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে তার অপূর্ণতার শেষ অধ্যায়ও পূর্ণতা পায়। তবে চার বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি যেন আরও ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হয়েছেন।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে মেসির গোলসংখ্যা ছিল ১৩। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে তিনি স্পর্শ করেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড। এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে এককভাবে বসেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বর্তমানে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা ১৮।
ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল আবেগ ও ইতিহাসের এক অনন্য মিশ্রণ। ম্যাচের শুরুতেই পেনাল্টি থেকে রেকর্ড ভাঙার সুযোগ পেয়েও অবিশ্বাস্যভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হন মেসি। তবে হতাশাকে শক্তিতে রূপ দিতে খুব বেশি সময় নেননি তিনি।
৩৮ মিনিটে ফাকুন্দো মেদিনার কাটব্যাক থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে গোল করে ক্লোসাকে পেছনে ফেলেন। ম্যাচের শেষদিকে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট এককভাবে নিজের মাথায় তুলে নেন।
রেকর্ড গড়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুভেচ্ছায় ভাসেন মেসি। সবচেয়ে আলোচিত বার্তাটি আসে স্বয়ং মিরোস্লাভ ক্লোসার কাছ থেকে। জার্মান কিংবদন্তি বলেন, ‘আমার কাছে লিওনেল মেসিই সর্বকালের সেরা ফুটবলার। অভিনন্দন, চ্যাম্পিয়ন।’ এর আগেও ক্লোসা জানিয়েছিলেন, তার রেকর্ড যদি কেউ ভাঙেন, তবে মেসির মতো একজন ফুটবল প্রতিভাই তার যোগ্য উত্তরসূরি।
মজার বিষয় হলো, ছয়টি বিশ্বকাপ খেললেও ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে কোনো গোল পাননি মেসি। বাকি প্রতিটি আসরেই গোল করেছেন তিনি। অন্যদিকে তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো টানা ছয়টি বিশ্বকাপেই গোল করে আরেকটি অনন্য রেকর্ড গড়েছেন।
২০০৬ সালে কিশোর প্রতিভা হিসেবে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করা মেসি আজ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি জিতেছেন বিশ্বকাপ, খেলেছেন একাধিক ফাইনাল এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন।
তবে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলীয় সাফল্যকেই বড় করে দেখছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, জয়ের জন্য আমি খুব খুশি। এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচ। পেনাল্টি মিস করেছিলাম, কিন্তু পরে আমরা পরিস্থিতি সামলে নিয়েছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দল জিতেছে এবং আমরা পরের পর্বের খুব কাছে পৌঁছে গেছি।
৩৯তম জন্মদিনে এসে মেসি শুধু আর্জেন্টিনার নয়, গোটা ফুটবল বিশ্বের জন্যই এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম। বয়স তার গতি কমাতে পারেনি, কমাতে পারেনি ইতিহাস গড়ার তাড়নাও। বরং ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন আবারও প্রমাণ করছে—লিওনেল মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি নিজেই এক জীবন্ত ইতিহাস।
আর সেই ইতিহাসে প্রতিনিয়ত নতুন অধ্যায় যোগ হচ্ছে তার বাম পায়ের জাদুতে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি