ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ইইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ জনজীবনকে চরম দুর্ভোগের মধ্যে ফেলেছে। একের পর এক তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙছে, বিভিন্ন দেশে জারি করা হচ্ছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও স্পেন। কোথাও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে, কোথাও বন্ধ রাখতে হয়েছে স্কুল, আবার কোথাও জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে।
এরই মধ্যে ফ্রান্সে তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচতে নদী ও জলাশয়ে নামতে গিয়ে গত এক সপ্তাহে অন্তত ৪০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগই তরুণ। প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি খুঁজতে গিয়ে তারা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
মঙ্গলবার ফ্রান্সে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ দিন রেকর্ড করা হয়েছে। জাতীয় গড় তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা দেশটির আবহাওয়া ইতিহাসে নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের বহু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে এবং কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে রাজধানী প্যারিসে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র আইফেল টাওয়ার এবং বিখ্যাত লুভর জাদুঘরের দর্শন সময়ও সীমিত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, দর্শনার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। দেশটির আবহাওয়া বিভাগ বিরল ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে। তীব্র গরমের কারণে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আবহাওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, লন্ডনসহ দক্ষিণ ইংল্যান্ডের কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা জুন মাসের জন্য নতুন রেকর্ড হতে পারে।
ইতালিতেও তাপপ্রবাহের তীব্রতা কমেনি। দেশটির ১৬টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রাজধানী রোম, অর্থনৈতিক কেন্দ্র মিলান, তুরিন এবং ভেনিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বাসিন্দাদের দিনের সবচেয়ে গরম সময় ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহারের ফলে কয়েকটি শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে।
অন্যদিকে স্পেনে তাপপ্রবাহের তীব্রতা কিছুটা কমতে শুরু করলেও দেশটির উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় এখনও উচ্চমাত্রার সতর্কতা বহাল রয়েছে। এর আগে দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে তাপপ্রবাহের ঘটনা আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন এবং তীব্র আকারে দেখা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবারের তাপপ্রবাহ স্বাভাবিকের তুলনায় গড়ে ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে ইউরোপজুড়ে তাপজনিত কারণে দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো না গেলে আগামী বছরগুলোতে আরও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ এবং নতুন নতুন তাপমাত্রার রেকর্ডের মুখোমুখি হতে হবে বিশ্বকে।
ক্রমবর্ধমান এই তাপপ্রবাহ শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য নয়, বিদ্যুৎ, পানি, কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: ইউরো নিউজ
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম