আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ওমান উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার একদিন পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে একাত্ম না হওয়ারও সতর্কবার্তা দিয়েছে তেহরান।
শুক্রবার (২৬ জুন) ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় ছয়টি দেশের যৌথ বিবৃতি ‘হস্তক্ষেপমূলক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উসকানিমূলক’। ওই বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের বিষয়ে ইরানের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘‘উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের ভূমিকাকে উপেক্ষা করে কিংবা অস্পষ্ট ব্যবস্থা, বিকল্প রুট বা সমান্তরাল সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’’
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, অনুমোদনবিহীনভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা তিনটি বিদেশি তেলবাহী জাহাজকে সতর্কবার্তা দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস। তবে এসব জাহাজের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, তারা এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে অবগত এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ব্যাহত করার সুযোগ ইরানকে দেওয়া হবে না।
সংকটের মধ্যেও শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তিন শতাংশের বেশি কমেছে। গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আংশিক স্বাভাবিক হওয়ার ফলে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানি বন্দরগুলোর একটি রাস তানুরা তেল বন্দর থেকে প্রায় চার মাস বন্ধ থাকার পর আবারও অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করেছে সৌদি আরামকো।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার পরিবহনও বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।
‘নির্বিঘ্ন ও শর্তহীন নৌচলাচল’ চায় যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো
উপসাগরীয় দেশগুলো সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে তা বড় ধরনের সংকট তৈরি করবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল এক যৌথ বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালিতে ‘স্বাধীন, শর্তহীন ও বাধাহীন’ নৌচলাচলের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ড্রোন সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়টিও আলোচনায় আনার দাবি জানায়।
জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি। তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ইরান ও ওমানের হাতে থাকা উচিত।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি আকবর ভেলায়াতি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘‘পারস্য উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর স্থিতিশীলতা দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনায় ইরানের ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল।’’
ওমান উপকূলে জাহাজে হামলার অভিযোগ
তাইওয়ানের শিপিং কোম্পানি এভারগ্রিন মেরিন জানিয়েছে, তাদের সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জাহাজ এভার লাভলি বৃহস্পতিবার ওমান উপকূলের কাছে একটি ‘অজ্ঞাত বস্তুর’ আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনাটি ঘটে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থার সুপারিশ করা রুটে চলাচলের সময়।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, হামলায় কেউ হতাহত হয়নি এবং জাহাজটি পরবর্তীতে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি ত্যাগ করে।
তবে রয়টার্সকে দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাহাজটির দিকে ইরান গুলি ছুড়েছিল। যদিও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি তেহরান। ইরানের নবগঠিত প্রণালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনুমোদনহীন রুট ব্যবহার করলে তার দায় জাহাজের মালিক, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও ক্যাপ্টেনকেই বহন করতে হবে।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান যদি অন্তর্বর্তী চুক্তির শর্ত—বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি—লঙ্ঘন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালাতে পারে।
এদিকে লি জে মিয়ং জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার তিনটি জাহাজ সপ্তাহান্তের মধ্যে হরমুজ প্রণালি ত্যাগ করবে। দেশটির মহাসাগর ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আরও আটটি দক্ষিণ কোরীয় জাহাজ ইতোমধ্যে ওই এলাকা থেকে বেরিয়ে গেছে।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে আবারও ইসরায়েলের লিফলেট বিতরণ
অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এখনো ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা, পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন এবং লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে।
শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননের মানসুরি শহরের ওপর থেকে বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশনা দিয়ে লিফলেট ফেলেছে ইসরায়েলি বাহিনী। গত শনিবার কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর এটিই প্রথম এমন ঘটনা।
ইসরায়েল জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলে হামলা প্রতিরোধে দক্ষিণ লেবাননে একটি ‘বাফার জোনে’ তারা সেনা মোতায়েন রাখবে। অন্যদিকে ইরানের দাবি, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইসরায়েলকে পুরোপুরি লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, ‘‘ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো হামলা চালানো হলে সেটিই হবে তেহরানের সবচেয়ে বড় ভুল।’’সূত্র: রয়টার্স
রিপোর্টার্স২৪/এসসি