ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে কথিত ড্রোন হামলার জেরে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এ হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে। তবে ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। হামলার পর একটি বিস্ফোরণের ভিডিও প্রকাশ করে তারা জানায়, অভিযানের কার্যক্রম শেষ হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক বন্দরের আশপাশে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের নৌবাহিনী অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তবে কোন কোন স্থাপনায় হামলা হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
গত সপ্তাহে সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত ভঙ্গের জন্য উভয় দেশই একে অপরকে দায়ী করছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলরত একটি কার্গো জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের শামিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ হামলার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছেন।
সেন্টকম এক বিবৃতিতে বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলে সহায়তা করবে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, "ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে চলছে। চুক্তির প্রয়োগ নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে আলোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু সহিংসতার জবাব সহিংসতার মাধ্যমেই দেওয়া হবে।"
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা যায়, হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে হরমুজ প্রণালির নিয়ম লঙ্ঘনকারী কিছু জাহাজের দিকে সিরিক এলাকা থেকে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হয়েছিল। পাশাপাশি কেরপান এলাকা থেকেও দুটি সতর্কতামূলক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
তবে শনিবার পূর্ব হরমোজগান অঞ্চলের বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সিরিক বন্দরের কোনো অবকাঠামো বা সরঞ্জামের ক্ষতি হয়নি এবং বন্দর স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো নতুন হামলার জবাব আরও কঠোরভাবে দেওয়া হবে। তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে রয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যেও একটি ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। ইসরায়েল ও লেবানন যুদ্ধ বন্ধে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছে। চুক্তি অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ এবং লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি এখনও স্পষ্ট নয়। হিজবুল্লাহ ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করবে না।
নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার আগে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করায় বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানি টার্মিনালগুলোর একটি সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর প্রায় চার মাস পর আবারও অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করেছে। একই সঙ্গে সার পরিবহনও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক শেষে হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের শর্ত বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অবাধ ও নিরাপদ নৌ চলাচলের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ইরান ও ওমানের হাতে থাকা উচিত। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলী আকবর ভেলায়েতি সতর্ক করে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিরাপত্তা অনেকাংশে তেহরানের সহনশীলতার ওপর নির্ভর করছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি