আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি : মহারাষ্ট্রে প্রবল বর্ষণের জেরে বিপর্যস্ত জনজীবন। সোমবার পুনেতে এক ভয়াবহ ভূমিধসে একটি আবাসিক বাড়ি চাপা পড়েছে, যার নিচে একই পরিবারের তিন সদস্য আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্রমাগত মুষলধারে বৃষ্টির কারণে মুম্বই ও পুনের মধ্যে সড়ক ও রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া দপ্তর আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মহারাষ্ট্রের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী গিরিশ মহাজন সোমবার জানিয়েছেন যে মুম্বই, পালঘর এবং রায়গড়ে রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টি হয়েছে এবং গত তিন-চার দিনে প্রায় ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। রবিবার গভীর রাতে মুম্বইয়ের মানখুর্দের জনতা নগরে একটি চারতলা বস্তির বাড়ি ভেঙে আরেকটি বাড়ির ওপর পড়ে। এতে পাঁচ শিশুসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মানখুর্দের এই দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন এক মা, তাঁর সন্তানেরা এবং পাশের বাড়ির কিছু শিশু যারা তাঁদের বাড়িতে বেড়াতে বা থাকতে এসেছিল। নিহতদের আলিয়া (৭), মুসকান (১৪), নিহাল (৬), নাবিয়া (২), মুনাফ (৭) এবং সোনি (৩২) হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ভারত আবহাওয়া বিজ্ঞান দপ্তর (আইএমডি) পুনের জন্য ‘রেড অ্যালার্ট’ এবং মুম্বইয়ের জন্য ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করেছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে অন্তত ১৬টি ট্রেন বাতিল এবং ৯টি ট্রেনের রুট পরিবর্তন করা হয়েছে। সেন্ট্রাল রেলওয়ের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, সোমবার ভোররাত আনুমানিক ৩:০৫ নাগাদ করজাত-লোনাভালা ভোর ঘাট সেকশনের ঠাকুরওয়াড়ির কাছে প্রথম বড় ভূমিধসের ঘটনাটি ঘটে। এর কিছু পরেই খন্ডালা ও মাঙ্কি হিলের মাঝে দ্বিতীয় ভূমিধসটি হয়।
সেন্ট্রাল রেলওয়ের প্রধান জনসংযোগ আধিকারিক স্বপ্নিল নীলা নিশ্চিত করেছেন যে ভোর ঘাট অঞ্চলের আপ, ডাউন এবং মিডল—তিনটি রেললাইনে কাদা ও পাথরের স্তূপে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর ফলে সিএসএমটি-পুনে ইন্দ্রায়ণী এক্সপ্রেস, ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস, ডেকান এক্সপ্রেস, ডেকান কুইন, প্রগতি এক্সপ্রেস এবং ধুলে এক্সপ্রেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনগুলি বাতিল করতে হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় লাইন পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছে এবং যাত্রীদের ভ্রমণের আগে ট্রেনের পরিস্থিতি জেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
সড়কপথের অবস্থাও সমান বিপজ্জনক। মুম্বই-পুনে এক্সপ্রেসওয়ে এবং পুরনো মুম্বই-পুনে হাইওয়ের উভয় লেনে যান চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস কর্তৃক এক্সপ্রেসওয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামের স্থায়ী সমাধান হিসেবে ৬,৬৯৫ কোটি টাকার ‘মুম্বই-পুনে এক্সপ্রেসওয়ে মিসিং লিঙ্ক’-এর উদ্বোধনের মাত্র নয় সপ্তাহ কাটতে না কাটতেই, বর্ষাজনিত ভূমিধসের কারণে করিডোরটি আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বাধ্য হয়ে যান চলাচলকে আবারও সেই পুরনো মুম্বই-পুনে হাইওয়েতে ঘুরিয়ে দিতে হয়েছে, যা এড়ানোর জন্যই মূলত এটি তৈরি করা হয়েছিল।
এই বিপর্যয় মহারাষ্ট্রের অন্যতম উচ্চাভিলাষী পরিকাঠামো প্রকল্পের জন্য বর্ষাকালের প্রথম বড় পরীক্ষা, যা দুর্ঘটনাপ্রবণ খন্ডালা ঘাট সেকশনের চেয়ে নিরাপদ, দ্রুত এবং আরও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা এই করিডোরটির কাঠামোগত প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
খোপোলি-কুসগাঁও মিসিং লিঙ্কের টানেল ২-এর কাছে ধস নামায় পুনেগামী সমস্ত গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হাইওয়ে ট্রাফিক পুলিশ কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, খন্ডালা ঘাট এলাকায় জলমগ্নতা এবং কাদা ধসের কারণে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর পাশাপাশি একটি কংক্রিটের পিলার ভেঙে পড়ায় এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশ সাধারণ মানুষকে অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মুম্বই ও পুনের মধ্যে যাতায়াত এড়িয়ে চলার অনুরোধ জানিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সোমবার মুম্বই, পুনে, থানে এবং পালঘর জেলার সমস্ত স্কুল ও কলেজে ছুটি ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
এদিকে, পুনে জেলার পাটান গ্রামে ধসে পড়া বাড়ির নিচে আটকে থাকা তিনজনকে উদ্ধারে নেমেছে ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স ও স্থানীয় পুলিশ। জেলার অন্য এক প্রান্তে, ঘোড়াবাড়ি রেলওয়ে স্টেশনের কাছে জলমগ্ন রাস্তায় আটকে পড়া একটি বেসরকারি বাসের ৩৭ জন যাত্রীকে সফলভাবে উদ্ধার করেছে এনডিআরএফ-এর একটি দল। প্রবল বর্ষণ, বন্যা পরিস্থিতি এবং দফায় দফায় ভূমিধসের কারণে দুই মহানগরীর মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং হাজার হাজার যাত্রী মাঝপথে আটকে আছেন।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব