ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: রোববার হরমুজ প্রণালিতে একটি কনটেইনার জাহাজে হামলার পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে তীব্র বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বড় সামরিক ঘাঁটিতে সিরিজ ড্রোন ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তারা। এছাড়া হরমুজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখারও ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওমানের জলসীমা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপারিশ করা পথে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটে। এর জের ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বোমাবর্ষণ শুরু হয়। এরপর গত সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় সাইপ্রাসের পতাকাবাহী 'এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি' নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে নতুন করে বিমান হামলা চালায় ইরান।
সেন্টকম জানায়, ইঞ্জিনকক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে জাহাজটি আর যাত্রা চালিয়ে যেতে পারেনি। এর ফলে বেসামরিক নাবিকেরা জাহাজটি ছেড়ে লাইফবোটে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এ ঘটনায় একজন বেসামরিক নাবিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজে আগের হামলাগুলোর জন্য জবাবদিহির মুখে পড়ার পরও সমঝোতা স্মারক মেনে চলার আরেকটি সুযোগ ইরানকে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা আবারও তা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। বিবৃতিটি শেয়ার করে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ লিখেছেন, 'ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তাদের এর মূল্য দিতে হবে।'
তবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) দাবি করেছে, 'নিয়ম লঙ্ঘনকারী' ওই জাহাজটি বারবার দেওয়া সংকেত অমান্য করে এবং নিজেদের যোগাযোগ ও অবস্থান শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (ট্র্যাকিং) বন্ধ করে অনুমোদিত পথ থেকে সরে যায়। এরপর সেটিকে লক্ষ্য করে প্রথমে সতর্কতামূলক গুলি এবং পরে নৌবাহিনীর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে থামতে বাধ্য করা হয়।
এই ঘটনার পরপরই ইরান ঘোষণা দেয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। ইরান জোর দিয়ে আসছে যে, তাদের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাওয়া পথটিই একমাত্র 'নিরাপদ' নৌপথ। আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্র কোনো 'আগ্রাসন' চালালে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে এবং অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
ইরান দাবি করেছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির বরাতে সেনাবাহিনী জানায়, বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ব্যবহার করে কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোলাবারুদের গুদাম এবং রাডার স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রাডার স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
এছাড়া জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটির মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি-তে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, তাদের হামলায় জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটির একটি কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার ও এমকিউ-৯ ড্রোন রাখা কয়েকটি হ্যাঙার ধ্বংস হয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর ভাষ্য, দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলার জবাব হিসেবেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে।
এদিকে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস পৃথক এক বিবৃতিতে জানায়, তারা কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, এতে একটি যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র এবং একটি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার ধ্বংস হয়েছে।
তবে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কাতারের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা সফলভাবে প্রতিহত করেছে।
অন্যদিকে, আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে তারা দ্বিতীয় একটি 'অপরাধী জাহাজে' হামলা চালিয়ে সেটিকে থামিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের 'আগ্রাসন' অব্যাহত থাকলে এর চেয়েও 'বিধ্বংসী' জবাব দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা চলতি সপ্তাহে ইরানে তৃতীয় দফার হামলা শেষ করেছে। সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার জন্য ইরানকে 'জবাবদিহির আওতায় আনতে' এসব অভিযান চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ অভিযানে প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, নৌ সক্ষমতা, গোলাবারুদের গুদাম, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনা। সংস্থাটি আরও জানায়, তিন রাতের অভিযানে মোট ৩০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এছাড়া সেন্টকম দাবি করেছে, মে মাসের শুরু থেকে তাদের বাহিনী ৮০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে সহায়তা করেছে, যেগুলোতে মোট প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছিল।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দুই দেশের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। ওই চুক্তিতে সব ধরনের সংঘাতের অবসান, ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার এবং দেশটির পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছিল।
তবে বর্তমান উত্তেজনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধবিরতি কার্যত 'শেষ' হয়ে গেছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, আলোচনা এখনও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়নি এবং মধ্যস্থতাকারীরা প্রক্রিয়াটি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন।
এদিকে মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়েছে, ট্যাংকারে হামলাকে 'ভুল' হিসেবে উল্লেখ করে ইরান মার্কিন কর্মকর্তাদের গোপনে জানিয়েছে, দেশটির একটি নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত অভ্যন্তরীণ উগ্র গোষ্ঠী এর জন্য দায়ী।
রিপোর্টার্স২৪/ এম এইচ