রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার (১৩ জুলাই) সারাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। তবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় এদিন পরীক্ষা নেওয়া হয়নি।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার্থীদের পড়তে হয়েছে চরম ভোগান্তিতে। কোথাও কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকা, ভ্যান কিংবা বিকল্প যানবাহনে চড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। অনেকেই আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সারাদেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন।
দুর্যোগের মধ্যেও পূর্বঘোষিত সূচি বহাল
সোমবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড (চট্টগ্রাম ছাড়া) এবং মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়। সময়সূচি অনুযায়ী পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথমপত্র ও যুক্তিবিদ্যা প্রথমপত্রের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে বৃষ্টি উপেক্ষা করে উপস্থিত হন পরীক্ষার্থীরা। কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার কেন্দ্রে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেখা গেছে।
এসব ভোগান্তির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
পানিতে ভিজে পরীক্ষা, ক্ষোভ শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের একটি ভিডিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেখানে দেখা যায়, পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তা ও কেন্দ্রের বারান্দায় পানি জমে আছে। কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর পোশাক, জুতা ও পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভিজে যায়।
ভেজা পোশাক নিয়েই তিন ঘণ্টার পরীক্ষা দিতে হয়েছে অনেক শিক্ষার্থীকে। বাইরে উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করেছেন অভিভাবকরা।
এক অভিভাবক বলেন, “পুরো শরীর ভেজা অবস্থায় একটি শিক্ষার্থী কীভাবে তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দেবে? এমন পরিস্থিতি কি কর্তৃপক্ষের চোখে পড়ে না?”
আরেক অভিভাবকের অভিযোগ, বৃষ্টির মধ্যে বারবার ভিজে পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপের মধ্যে পড়ছে।
শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা স্থগিত না করায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন অনেকে।
বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ভূমিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মন্তব্য, সমালোচনা ও ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দেখা গেছে। অনেকেই পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছেন।
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারাও এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাদের দাবি, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা আয়োজন শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
শিক্ষাবিদদের প্রশ্ন
পাবলিক পরীক্ষায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেক শিক্ষাবিদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, কোমর বা হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে যেতে হওয়া কোনোভাবেই ন্যায্য নয়। এমন পরিস্থিতিতে সব পরীক্ষার্থীর জন্য সমান পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বৈরী আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়ে আগেই পরীক্ষার সূচি পুনর্নির্ধারণ করা উচিত ছিল।
ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস কয়েক দিন আগেই ছিল। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকলে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, বর্ষা মৌসুমে প্রতি বছর একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। দুর্যোগকালে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
দায় নিচ্ছে না শিক্ষা বোর্ড
এদিকে পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তির ঘটনায় দায় নিচ্ছে না শিক্ষা বোর্ডগুলো। তাদের দাবি, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরীক্ষা স্থগিত বা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম ছাড়া অন্যান্য জেলার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।
তিনি বলেন, রাতের বৃষ্টিতে কয়েকটি এলাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নজরে রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও শিক্ষা সচিব আবদুল খালেকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম