উত্তম কুমার (বাউফল): এমন কালজয়ী গানের পাখি আজ আর চোখে পড়ে না। গ্রাম বাংলার রূপ আর সৌন্দর্য বাড়ানো সেই হলুদিয়া পাখি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। শোনা যায় না তার শ্রুতিমধুর সেই "ও ভাই তোর কত ভোগ" ডাক।
বৈজ্ঞানিক নাম Oriolus xanthornus। ইংরেজি নাম Black-hooded Oriole। বাংলায় একে হলুদ সোনাবউ, কুটুম পাখি, বেনেবউ বা ইষ্টিকুটুম নামেও ডাকে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর বিচরণ রয়েছে।
রূপে-রঙে অনন্য পুরো শরীরজুড়ে সোনালি হলুদের উজ্জ্বল রং। ঠোঁট গোলাপি-লালচে। কালো চোখের চারপাশে লাল বৃত্ত। গলা, লেজ ও ডানায় কালো রঙ পাখিটির রূপ আরও বাড়িয়ে দেয়। স্ত্রী পাখি পুরুষের তুলনায় একটু ফ্যাকাশে। শরীরের বেশিরভাগ অংশ হলুদ হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ একে হলুদিয়া বা হলদিয়া পাখি বলেই চেনে।
স্থানীয়দের কাছে এটি কুটুম পাখি নামেই বেশি পরিচিত। একসময় খুব ভোরে বাড়ির গাছে কুটুম পাখির ডাক শুনলে মানুষ বিশ্বাস করত আজ বাড়িতে মেহমান আসবে।
দক্ষিণ বাংলার তেঁতুলিয়া বেষ্টিত বাউফলের মানুষ এই পাখির ডাক শুনতেন "ও ভাই তোর কত ভোগ" হিসেবে। যদিও পাখিটি আসলে এভাবে শব্দ করে না। এটি ছিল মানুষের কল্পনায় সৃষ্ট সাংকেতিক অর্থ।
দাদী-নানীর মুখে এই পাখিকে ঘিরে প্রচলিত আছে এক রূপকথা। গল্পে আছে, একদিন দুই ভাই জঙ্গলে গেলে এক ভাইকে বাঘে খেয়ে ফেলে। অপর ভাই প্রাণ বাঁচাতে হলুদিয়া পাখি হয়ে যান। তারপর থেকে সে ভাইয়ের জন্য কাঁদে আর ডাকে "ও ভাই তোর কত ভোগ"।
সাধারণত এপ্রিল থেকে জুলাই এদের প্রজনন মৌসুম। ২-৪টি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলে গভীর বনের উঁচু গাছে ঝুলন্ত বাসা বাঁধে। কীট-পতঙ্গ, ফল ও ফুলের নির্যাসই এদের প্রধান খাবার। কিন্তু এখন আর সহসা চোখে পড়ে না এই জীববৈচিত্র্যের অপূর্ব নিদর্শনটিকে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিসম্পদ অনুষদের ডিন ড. খোন্দকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "অনেক পাখিই এখন বিলুপ্তির পথে। হলুদিয়া পাখির প্রধান খাবার ফল-মূল ও কীট-পতঙ্গ। বর্তমানে ফল-মূলে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পাখিগুলো বিষক্রিয়ায় মারা যাচ্ছে। আবার এই পাখি গভীর বনে বসবাস করে। গভীর বন উজাড় হয়ে যাওয়ায় তাদের বাসস্থান ও প্রজনন দুটোই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণেই পাখিটি এখন আর নজরে আসে না। সর্বশেষ কবে হলুদ পাখি দেখেছি তা-ও মনে নেই।"
এক সময়কার গ্রাম বাংলার চেনা দৃশ্য আজ স্মৃতি। কীটনাশকের ব্যবহার কমানো, গাছ কাটা বন্ধ ও বন সংরক্ষণ করা গেলেই হয়তো আবার ফিরবে "সোনারই বরণ" সেই হলুদিয়া পাখি।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব