এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া: অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো মানুষ আমাদের সমাজে সব সময় খুব বেশি জন্মগ্রহণ করেন না। বহু কাল পরপর এমন মানুষের আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা শুধু একটি প্রজন্মের নন, বহু প্রজন্মের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকেন। তাঁদের উপস্থিতি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা বৃদ্ধি করে না; একটি জাতির নৈতিক শক্তিকেও সমৃদ্ধ করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সত্য, সততা ও মানবিকতার পথ দেখায়।
বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মননশীল জগতের এক নির্মোহ, নির্ভীক ও প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। সততা, প্রগতিশীল চিন্তা এবং দেশ প্রেমের কারণে তিনি ‘জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে সমাদৃত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও লেখক আজীবন দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে সাধারণ মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও সমাজসংস্কারের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।
১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় তাঁর জন্ম। বাবা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম এবং মা জাহানারা খাতুন। ১৯৫৯ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬১ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখান থেকে ১৯৬৫ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
চার দশকেরও বেশি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। এ সময় তিনি শুধু শিক্ষক হিসেবেই নন, একজন চিন্তাবিদ ও পথপ্রদর্শক হিসেবেও ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নজরুল রচনাবলীর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন এবং ১৯৮২ সাল থেকে প্রগতিশীল সাময়িকী লোকায়ত সম্পাদনা করেছেন।
তিনি একুশটিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২), নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি (১৯৮১), রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৯), আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা (২০০৪) এবং রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ (২০০৮)। তিনি বার্ট্রান্ড রাসেলের Political Ideals গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ রাজনৈতিক আদর্শ প্রকাশ করেন। এ ছাড়া ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং স্বদেশচিন্তা ও আকবরের রাষ্ট্রসাধনা তাঁর সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের দুই সন্তান ড. শুচিতা শরমিন ও ফয়সল আরেফিন দীপন। ড. শুচিতা শরমিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফয়সল আরেফিন দীপন ছিলেন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর উগ্রবাদীদের হাতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন।
পুত্র হত্যার প্রতিক্রিয়ায় শোকাহত পিতা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন উভয় পক্ষই দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।
সন্তান হারানোর গভীর বেদনার মধ্যেও তিনি প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলেননি, কোনো অশুভ বা অনৈতিক শব্দ উচ্চারণ করেননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কয়েকজন অপরাধীর বিচার কিংবা শাস্তি সমাজের গভীরে জন্ম নেওয়া অসুস্থতা দূর করতে পারে না। প্রয়োজন মানুষের চিন্তার পরিবর্তন, নৈতিক জাগরণ এবং সামাজিক পুনর্গঠন। এই বক্তব্য শুধু একজন শোকাহত পিতার অনুভূতি ছিল না; এটি ছিল একজন মানবতাবাদী চিন্তাবিদের গভীর জীবনদর্শনের প্রকাশ। ব্যক্তিগত প্রতিশোধের পরিবর্তে জাতির নৈতিক পুনর্জাগরণের কথা ভাবতে পারেন এমন মানুষ সত্যিই বিরল।
আজকের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমন শিক্ষকের সংখ্যা খুব বেশি নেই, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন তাঁদেরই একজন। শিক্ষক হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, তা সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন তাঁর শিক্ষার্থীরা। ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে যতটুকু জানার সুযোগ হয়েছে, তাতে বলতে দ্বিধা নেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, নিরহংকার এবং শিক্ষার্থীবান্ধব। তাঁর মধ্যে কখনো আত্মগরিমা বা উদ্ধত মনোভাব দেখা যায়নি।
তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, সহজ ভাষায় উত্তর দিতেন এবং এমনভাবে আলোচনা করতেন যেন তিনি শেখাচ্ছেন না, বরং সবার সঙ্গে মিলেই ভাবছেন। প্রকৃত শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর প্রজ্ঞা নয়, তাঁর মানবিকতা। সেই মানবিকতার পরীক্ষায় তিনি অনন্য ছিলেন।
ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর চিন্তা ছিল গভীর, বাস্তবমুখী এবং মানবিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা রাষ্ট্রধর্ম যে প্রশ্নই হোক না কেন, যদি তা সমাজে বিভাজন, বিদ্বেষ ও সংঘাত সৃষ্টি করে, তবে সেই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জাতির জন্য আত্মঘাতী হয়ে ওঠে।
মতাদর্শের চেয়ে মানুষ, প্রতিশোধের চেয়ে পুনর্মিলন এবং বিভাজনের চেয়ে ঐক্য এই ছিল তার জীবনদর্শনের মূল কথা। আজকের বাংলাদেশে যখন মতের ভিন্নতার কারণে মানুষ মানুষকে শত্রু মনে করছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজনীতির মঞ্চ সবখানেই ভাষা ক্রমশ আক্রমণাত্মক, অসহিষ্ণু ও বিভাজনমুখী হয়ে উঠছে, তখন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতো মানুষের প্রয়োজনীয়তা রাষ্ট্র ও সমাজ গভীরভাবে অনুভব করছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবী কখনো বিভক্ত সমাজকে আরও বিভক্ত করেন না; বরং সংলাপ, সহমর্মিতা, মানবিকতা ও ঐক্যের পথ দেখান।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন নীতিবাদী রাজনৈতিক দার্শনিক। তাঁর চিন্তা ও লেখায় সব সময়ই উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন ও আশার প্রকাশ ঘটেছে।
তিনি শুধু একজন অধ্যাপক বা লেখক ছিলেন না; ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, যিনি সাধারণ মানুষের মুক্তি ও সমাজের অগ্রগতি নিয়ে আজীবন চিন্তা করেছেন। তাঁর প্রবন্ধ, গবেষণা ও সম্পাদনা বাংলাদেশের চিন্তাজগতকে সমৃদ্ধ করেছে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রশ্নে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আজও অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি ছিলেন কর্মমুখী চিন্তার মানুষ। রাষ্ট্র, সমাজ, মানুষ, রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, মনোবিজ্ঞান, নীতিবিজ্ঞান, জ্ঞানতত্ত্ব ও ইতিহাস বিষয়ে তাঁর যুক্তিনির্ভর গবেষণামূলক রচনা আমাদের চেতনা ও বিবেচনাবোধকে সমৃদ্ধ করেছে।
আবুল কাসেম ফজলুল হক দেশের শ্রমিক-কৃষক, গরিব, মেহনতি ও মধ্যবিত্ত মানুষের একজন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক সচেতন বুদ্ধিজীবী ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও উন্নতির জন্য লিখেছেন এবং দেশ ও সমাজের অগ্রগতির প্রশ্নে নিরন্তর চিন্তা করেছেন। তার চিন্তাচেতনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশ এবং দেশের মানুষ।
দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সারাজীবন মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেছেন, লিখেছেন। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন একজন বাংলাদেশপন্থী বুদ্ধিজীবী। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ছাড়া কোনো রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন টেকসই হতে পারে না। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন এবং প্রবন্ধকে প্রতিবাদের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
তিনি কোনো প্রশাসনিক পদ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কিংবা সুবিধাভোগী অবস্থানের কারণে সম্মানিত হননি; বরং স্বাধীন চিন্তা, আত্মমর্যাদাবোধ, নির্লোভ জীবনযাপন এবং সত্য উচ্চারণের সাহসের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম