রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: মা-বাবার মধ্যে তালাক নিয়ে বিরোধ থাকলেও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না। সন্তানের ভরণপোষণ কোনোভাবেই মা-বাবার তালাকসংক্রান্ত বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি শিশুর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার বলে রায়ে স্পষ্ট করেছেন হাইকোর্ট।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) হাইকোর্টের এই গুরুত্বপূর্ণ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। সম্প্রতি বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় প্রদান করেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে পক্ষদ্বয়ের মধ্যে বিয়ে হয়। পরবর্তীতে স্ত্রী ও তাদের নাবালক কন্যা সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের দাবিতে মামলা করা হয়। জবাবে স্বামী দাবি করেন, তিনি এর আগেই স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। তবে ফ্যামিলি কোর্টে তিনি আইন অনুযায়ী সেই তালাক প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন। ফলে আদালত স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি প্রদান করেন।
এরপর স্বামী নতুন করে একটি ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করে দাবি করেন, তালাক কার্যকর হয়েছে। সেই মামলাকে ভিত্তি করে তিনি ভরণপোষণের ডিক্রির এক্সিকিউশন স্থগিত করার আবেদন করেন। নিম্ন আদালত আবেদনটি খারিজ করলে বিষয়টি হাইকোর্টে গড়ায়।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, কেবল নতুন একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, এমন অজুহাতে পূর্বে প্রদত্ত চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। কোনো সক্ষম আদালত ডিক্রি স্থগিত না করা পর্যন্ত সেটি কার্যকর থাকবে এবং এক্সিকিউশন কোর্ট সেই ডিক্রি বাস্তবায়নে বাধ্য।
আদালত আরও বলেন, যে তালাক আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় বা কার্যকর হয়নি, সেই তালাকের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। এমন তালাক বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটাতে পারে না এবং দেনমোহর বা ভরণপোষণের ডিক্রি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কোনো আইনি বাধা সৃষ্টি করতে পারে না।
রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বিবাহ, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং বৈবাহিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র এখতিয়ার ফ্যামিলি কোর্টের। রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ।
হাইকোর্ট বলেন, একজন নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের অধিকার একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। মা-বাবার মধ্যে তালাক নিয়ে বিরোধ থাকলেও সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না। কোনো পিতা কেবল তালাকসংক্রান্ত বিরোধের অজুহাতে সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না।
রায়ে আরও বলা হয়, এক্সিকিউশন কোর্টের দায়িত্ব কেবল বিদ্যমান ডিক্রি বাস্তবায়ন করা। তারা নতুন করে তালাক বৈধ কি না কিংবা বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান আছে কি না এসব প্রশ্নের বিচার করতে পারে না। ডিক্রির বাইরে গিয়ে নতুন কোনো বিরোধ নিষ্পত্তির এখতিয়ারও তাদের নেই।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, পূর্বে দাবি করা তালাক যদি আইনগতভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয় এবং স্বামী সত্যিই বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটাতে চান, তাহলে আইন অনুযায়ী নতুন করে তালাক দেওয়ার সুযোগ তার রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনা পূর্বে প্রদত্ত ডিক্রির অধীনে সৃষ্ট দেনমোহর ও ভরণপোষণের দায় থেকে তাকে কোনোভাবেই মুক্তি দেয় না।
হাইকোর্ট রুল খারিজ করে নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন। একই সঙ্গে আদালত স্বামীকে দেনমোহরের বকেয়া এবং স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের সব বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দেন।
রায়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে আরও সুদৃঢ় করা হয়েছে। প্রথমত, তালাকের আইনগত কার্যকারিতা অবশ্যই আইন অনুযায়ী প্রমাণিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন আইনগত অধিকার। তৃতীয়ত, নতুন মামলা দায়ের করে কোনো চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। ফলে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং নারী ও শিশুর আইনগত অধিকার সুরক্ষায় এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
আদালতে স্বামীর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শহিদুল ইসলাম। অন্যদিকে স্ত্রীর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাকে সহযোগিতা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিলা রহমান ও ইফাত হাসান শাম্মি।
রায় প্রসঙ্গে আইনজীবী ইশরাত হাসান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে এই রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী বা নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ এড়ানো যাবে না। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন আইনগত অধিকার এবং বিবাহ, তালাক ও ভরণপোষণসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একচ্ছত্র এখতিয়ার ফ্যামিলি কোর্টের। আমার মতে, নারী ও শিশুর অধিকার সুরক্ষা এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম