স্পোর্টস ডেস্ক: দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার অন্ধভক্ত হয়েই ফুটবলের প্রেমে পড়া মাশরাফি বিন মুর্তজার। কিন্তু সেই ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এক গভীর আক্ষেপ; জীবনে একবারও সামনে থেকে দেখা হয়নি ফুটবল মহাতারকাকে।
এরপর আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করতে গিয়ে বছরের পর বছর দেখেছেন শুধু হতাশা। ক্যানিজিয়া, বাতিস্তুতা, ওর্তেগা, ভেরন, ক্রেসপো কিংবা আইমারের মতো তারকাদের ভালোবেসেও শেষ পর্যন্ত শুনতে হয়েছে বহু কটুকথা!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক দীর্ঘ আবেগঘন লেখায় বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক ফিরে গেছেন সেই দিনগুলোতে।
শুরুতেই মাশরাফি লিখেছেন, ‘একজন পুরোদস্তুর দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা ভক্ত হিসেবে বড় হয়েছি। মনের ভেতর একটা আফসোস সব সময়ই ছিল, জীবনে একবারও মানুষটাকে সামনে থেকে দেখতে পারলাম না।
গুরু চলে যাওয়ার পর সেই আফসোস আরও গভীর হয়ে বুকের ভেতর গেঁথে বসে। যার জন্য আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক হয়েছি, সেই দলকেই দিনের পর দিন হারতে দেখেছি।
ক্যানিজিয়া, বাতিস্তুতা, ভেরন, ওর্তেগা, ক্যাম্বিয়াসো, ক্রেসপো, আয়ালা, আইমার, লোপেস—এমন কতজনকে হৃদয়ের নায়ক বানিয়ে খেলা দেখেছি, কিন্তু শেষে শেষে হতাশা নিয়ে ঘুমিয়েছি।’
মাশরাফির পরিবারের প্রায় সবাই ব্রাজিলের সমর্থক হলেও তিনি ছিলেন একা আর্জেন্টিনার পক্ষে। বিশ্বকাপ এলেই চারপাশে ব্রাজিলের উৎসব, আর তার ভাগ্যে জুটত নীরব হতাশা, ‘সবচেয়ে বেশি চাপ অনুভব করেছি নিজের বাড়িতে। পরিবারের প্রায় সবাই যখন ব্রাজিলের সমর্থক, তখন স্রোতের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আমি একা আর্জেন্টিনা। বিশেষ করে ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপে বাবা, চাচা, মামাদের দেখেছি ফাইনাল উপলক্ষে বাসায় বিশাল আয়োজন করতে। পাড়ার সব ব্রাজিল সমর্থক একসঙ্গে খেলা দেখত, উল্লাস করত; আমি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ১৯৯৮ সালের পর, বিশেষ করে ২০০২ থেকে, সেই দৃশ্যগুলো আর তেমন দেখিনি। তবে আজ আমার ছোট ভাই, বোন, এমনকি আমার ছেলে-মেয়েও আর্জেন্টিনার সমর্থক; হয়তো আমার কাছ থেকেই এই ভালোবাসাটা উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে।’
২০০৬ বিশ্বকাপের আগে কেনিয়া সফরে একটি আর্জেন্টিনার জার্সি কিনেছিলেন। পেছনে লেখা ছিল ‘মেসি’। তখনও এই তরুণকে নিয়ে খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল না তার। কারণ, ওর্তেগাকেও একসময় ‘নতুন ম্যারাডোনা’ বলা হয়েছিল, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
২০১৪ সালের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়ায় মাশরাফিকে, ‘২০০৬ বিশ্বকাপে কোচ মেসিকে ঠিকমতো মাঠেই নামালেন না। এরপর ২০১০ বিশ্বকাপে আমারই নায়ক ম্যারাডোনা কোচ হয়ে এলেন। ভাবলাম, এবার হয়তো কিছু হবে। কিন্তু না, মেসি পাঁচ ম্যাচ খেলে একটাও গোল করতে পারলেন না। ২০১৪ বিশ্বকাপ, আমরা ফাইনালে। প্রতিপক্ষ জার্মানি বলে যে ভয় ছিল, সেটাই সত্যি হলো। হিগুয়েইন হয়ে উঠলেন আমাদের সব ক্ষোভ আর হতাশার স্থায়ী প্রতীক। মেসির সেই ওয়ান-অন-ওয়ান সুযোগ মিস করতে দেখাটা ছিল অসহনীয় যন্ত্রণার।’
একসময় এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন যে, মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণায় কষ্টের বদলে স্বস্তিই অনুভব করেছিলেন, ‘একজন মানুষ জীবনে আর কতই সুযোগ পাবে, কতবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে পারে! মেসি কি পারবেন? মেসি যখন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন, সবার মন খারাপ; কিন্তু আমি খুশি হয়েছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, “সে বার্সেলোনায় খেলুক, ক্লাবের হয়ে সব শিরোপা জিতুক। তার বিশ্বকাপ জেতা আর হবে না।” আমি কখনোই বার্সেলোনার সমর্থক ছিলাম না। রোনালদিনিয়োর জন্য বার্সেলোনা ও ‘আর নাইনের’ জন্য রিয়াল মাদ্রিদ ফলো করেছি।’
মাশরাফি আরও লেখেন, ‘অবসর ভেঙে মেসির ফিরে আসাটা ছিল আরও কষ্টের। ট্রলের শিকার হয়েছি, বিদ্রুপ শুনেছি। ২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হারের পর সব অনুভূতিই শেষ হয়ে যায়, শান্ত হয়ে পড়ি। মেনে নিয়েছিলাম, এই জীবনে হয়তো আর কোনো দিন মন খুলে আনন্দ করার সুযোগ পাব না। হতাশার কারণে ২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালের আগ পর্যন্ত একটা ম্যাচও দেখিনি। কিন্তু হাজারটা শঙ্কা নিয়ে ফাইনাল দেখতে বসেছিলাম। শেষমেশ ডি পলের সেই নিখুঁত থ্রু থেকে ডি মারিয়ার অসাধারণ ফিনিশ। ট্রফি জেতার পর ভাবলাম, হয়তো ফাইনালের অভিশাপ শেষ হলো।’
ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের দিন মাশরাফি অঝোরে কেঁদেছেন, আবার উন্মাদের মতো উদযাপনও করেছেন, ‘২০২২ বিশ্বকাপে নতুন আশা নিয়ে বসলাম। কিন্তু কীসের কী! প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হার! পরদিন বিপিএলের প্লেয়ার ড্রাফটে সবার প্রশ্ন আর্জেন্টিনাকে নিয়ে। মন খারাপ আর রাগ থেকে বলেছিলাম, “ওরা জিতলেই কী, হারলেই কী!” তারপর মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই দুর্দান্ত গোল, পোল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেও জয়। এরপরের গল্প তো সবারই জানা। কিন্তু ২০২২ বিশ্বকাপজুড়ে আর্জেন্টিনা যে স্নায়ুর পরীক্ষা নিয়েছে, তা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের সেই দিনটি ছিল ফুটবল দর্শক হিসেবে আমার জীবনের সর্বোচ্চ শিখর, স্বপ্নচূড়া ছোঁয়ার মতো। সেদিন আমি অঝোরে কেঁদেছি, আবার উন্মাদের মতো উদযাপন করেছি। মনে হয়েছিল, ফুটবল দর্শক হিসেবে জীবনের অনেক চাওয়া একসঙ্গে পূর্ণতা পেল। স্রেফ ক্লাব কিংবদন্তি থেকে বিশ্ব ফুটবলের এক অমর কিংবদন্তি হয়ে উঠতে দেখে ড্রামের তালে তালে, “মেসি! মেসি!” বলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেছি।’
মাশরাফি চেয়েছিলেন, মেসি যেন ডি মারিয়ার সঙ্গে একসঙ্গে বিদায় নেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি চাইনি মেসি এই বিশ্বকাপ খেলুক। ২০২৪ কোপা আমেরিকা জয়ের পরই চেয়েছিলাম, বন্ধু ডি মারিয়ার সঙ্গে একসঙ্গে বিদায় নিক মেসি। কারণ, জীবনে সম্ভাব্য সবকিছুই জিতে ফেলেছেন তিনি। চাইনি বিদায়টা তিক্ত অভিজ্ঞতার হোক। কিন্তু আপনি আমার সব ধারণা ভুল প্রমাণ করলেন, আরেকটি বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে গেলেন। এটা ব্যাখ্যা করতে ফুটবল জ্ঞানের যে গভীরতা দরকার, তা আমার নেই। শুধু একটাই চাওয়া, শেষ ম্যাচটা আপনি নিজের মতো করে উপভোগ করুন।’
মাশরাফির বার্তা একেবারেই ব্যক্তিগত, অথচ কোটি সমর্থকের মনের প্রতিধ্বনিই, ‘আপনার কাছ থেকে যা পাওয়ার ছিল, ২০২২ বিশ্বকাপে আপনি আমাদের দিয়ে দিয়েছেন। বিদায়বেলায় আপনার কাছে আর কোনো চাওয়া নেই। বরং আমাদের অগাধ ভালোবাসাটুকু যেন স্টেডিয়ামের প্রতিটি দর্শক আপনার কাছে পৌঁছে দেয়। সেই ভালোবাসা আপনি গ্রহণ করে বৃত্তটা পূরণ করুন, মহানায়ক। লিও, আপনি বিদায়বেলায় শুধু ট্রফির গল্প রেখে যাচ্ছেন না; আপনি রেখে যাচ্ছেন মানুষের এক জীবনের দীর্ঘ হতাশা পেরিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখার অমর এক উত্তরাধিকার। আপনার সবচেয়ে বড় সমালোচকও গোপনে আপনাকে অনুসরণ করে, এটাই আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন।’
একদশ শেষে মাশরাফির লিখেছেন, ‘আপনি শুধু ফুটবলের একজন নায়ক নন, আপনি লক্ষ কোটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেরও এক মহানায়ক।’
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব