স্টাফ রিপোর্টার: আজ ১৮ জুলাই। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও আলোচিত দিনের দুই বছর পূর্ণ হলো। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, প্রাণহানি, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। রাতেই সরকার দেশব্যাপী ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলে কার্যত বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। আন্দোলনের ইতিহাসে দিনটি এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত।
১৮ জুলাই সকাল থেকে উত্তরা, মহাখালী, মিরপুর, ধানমন্ডি, রামপুরা, বাড্ডা, প্রগতি সরণি ও যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারী, পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। উত্তরা ছিল সংঘর্ষের প্রধান কেন্দ্র। সেখানে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের প্রতিরোধে কয়েক ঘণ্টা উত্তেজনা চলে।
উত্তরায় পুলিশের একটি গাড়ি আন্দোলনকারীদের ওপর উঠে যাওয়ার দৃশ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। এদিন সেখানে নিহতদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, যিনি আন্দোলনকারীদের মধ্যে খাবার ও পানি বিতরণ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। ধানমন্ডিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ। যাত্রাবাড়ীতে দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সাংবাদিক মেহেদি হাসান।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। মহাখালীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও বনানী সেতু ভবনে আগুন দেওয়া হয়। মিরপুর-১০ নম্বরে পুলিশ বক্স এবং রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) প্রধান কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগে সম্প্রচার ব্যাহত হয়।
আন্দোলন এদিন রাজধানীর বাইরে নরসিংদী, চট্টগ্রাম, সাভার, মাদারীপুর, রংপুর ও সিলেটসহ অন্তত ৪৭ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা ২৭ থেকে ৩১ জন এবং আহতের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়।
পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে ১৮ জুলাই রাত ৯টার পর সরকার দেশব্যাপী ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। এর আগে ১৭ জুলাই রাত থেকেই মোবাইল ইন্টারনেট কার্যত অচল ছিল। ফলে সংবাদ আদান-প্রদান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল সেবা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে পাঁচ দিন ব্রডব্যান্ড এবং আট দিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট হিসেবে আলোচিত হয়।
ইন্টারনেট বন্ধের কারণ হিসেবে প্রথমে খাজা টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের কথা বলা হলেও পরে আইএসপিএবি জানায়, সরকারি নির্দেশেই ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী, বিটিআরসি ও এনটিএমসির ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
দিনের শেষ দিকে সরকার কোটা সংস্কারে নীতিগত সম্মতির কথা জানিয়ে আলোচনার আহ্বান জানালেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, প্রাণহানির মধ্যে কোনো সংলাপ হতে পারে না।
১৮ জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়। মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও ফারহান ফাইয়াজের মৃত্যু আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়। পরবর্তীতে টেলিযোগাযোগ খাতে সংস্কার এবং ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি