ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই ঠাকুরগাঁও মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছিলেন রাশেদা আক্তার। চিকিৎসকদের আশ্বাস আর সাশ্রয়ী খরচের কথা চিন্তা করে মনে আশা ছিল, সরকারি এ প্রতিষ্ঠানেই নিরাপদে জন্ম নেবে তার সন্তান। কিন্তু প্রসববেদনা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার যখন হাসপাতালে পৌঁছালেন, মুহূর্তেই ভেঙে গেল তার সেই স্বপ্ন।
কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন, স্বাভাবিকভাবে প্রসব (নরমাল ডেলিভারি) সম্ভব নয়, জরুরি অস্ত্রোপচার (সিজারিয়ান) প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতালে অ্যানেস্থেশিয়া (অজ্ঞান করার) বিশেষজ্ঞ না থাকায় গত চার মাস ধরে সিজারিয়ান কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ। ফলে তাকে অন্য কোনো বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ কথা শুনেই হাসপাতালের বারান্দায় কান্নায় ভেঙে পড়েন রাশেদা। তার স্বামী একটি ছোট দোকানের কর্মচারী। সীমিত আয়ের এই সংসারে বেসরকারি ক্লিনিকে সিজার করানোর বিপুল ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে আকাশকুসুম কল্পনা।
অশ্রুসিক্ত চোখে রাশেদা আক্তার বলেন, প্রথম মাস থেকেই এই হাসপাতালের ডাক্তারদের দেখাইছি। তারা বলেছিল এখানেই সব ব্যবস্থা হবে। এখন শেষ সময়ে এসে বলছে সিজার হবে না, বাইরে নিয়ে যান। আমাদের মতো গরিব মানুষের কি বেসরকারি ক্লিনিকে যাওয়ার সামর্থ্য আছে? এখানে ব্যবস্থা থাকলে তো আমাদের এই বিপদে পড়তে হতো না।
শুধু রাশেদাই নন, এই চিকিৎসাকেন্দ্রে এসে প্রতিদিন এমন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত অন্তঃসত্ত্বা নারী। অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের অভাবে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ঠাকুরগাঁও মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে প্রসূতিদের অস্ত্রোপচার সেবা বন্ধ রয়েছে। ফলে জরুরি মুহূর্তে দরিদ্র রোগীদের বাধ্য হয়ে ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা জেলা সদর হাসপাতালে।
সরেজমিনে দেখা যায়, একসময় প্রসূতি ও নবজাতকদের ভিড়ে মুখরিত থাকা কেন্দ্রটির ওয়ার্ডগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। অপারেশন থিয়েটারের দরজায় ঝুলছে তালা, নেই কোনো কর্মব্যস্ততা। চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকায় দিন দিন কমছে রোগীর সংখ্যা। লোকমুখে সেবা বন্ধের খবর শুনে অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারী এখন শুরুতেই অন্য হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন।
রাশেদার স্বামী জহিরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে ভালো চিকিৎসা পাব বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু এখন মাঝরাস্তায় আমাদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো হচ্ছে। ধারদেনা করে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু এত টাকা কীভাবে শোধ করব জানি না।
একই ধরনের অসহায়ত্বের কথা জানালেন সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়ন থেকে আসা ফরিদা বেগম। তিনি বলেন, গ্রামের মানুষের ভরসা ছিল এই হাসপাতাল। কম টাকায় ভালো সেবা পাওয়া যেত। কিন্তু এখানে এসে শুনি ডাক্তার নাই, সিজার হয় না। আমাদের মতো গরিব মানুষের পিঠ তো দেয়ালে ঠেকে গেছে।
রোগীর স্বজন শাহিন আলম বলেন, নরমাল ডেলিভারি না হলেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাত ধুয়ে ফেলে। তড়িঘড়ি করে অন্য হাসপাতালে রেফার করে দেয়। এই জরুরি অবস্থায় রোগী নিয়ে টানাটানি করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অতিরিক্ত টাকা জোগাড় করাও কষ্টের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু চিকিৎসকের সংকটই নয়, কেন্দ্রটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে তীব্র চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি। প্রসূতিদের সাধারণ প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ডেলিভারি কিট’ পর্যাপ্ত পরিমাণে মিলছে না। ফলে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক প্রসবের সেবাও। এর ওপর কেন্দ্রটির একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটিও অকেজো হয়ে পড়ে আছে দীর্ঘ দুই বছর ধরে।
সেবা বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে ঠাকুরগাঁও মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. লাবনী বসাক বলেন, "গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের একমাত্র অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অবসরে গেছেন। প্রসূতিদের স্বার্থে অবসরের পরও তিনি এক মাস অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এরপর থেকে পদটি শূন্য। অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ ছাড়া সিজারিয়ান অপারেশন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে জটিল রোগীদের আমরা রেফার করছি।
অ্যাম্বুলেন্স ও বাজেট সংকটের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, গত দুই বছর ধরে অ্যাম্বুলেন্সের জ্বালানির জন্য কোনো সরকারি বরাদ্দ বা বাজেট পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় একটি পেট্রল পাম্পের কাছে হাসপাতালের বকেয়া জমেছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। বকেয়া পরিশোধ না করায় পাম্প কর্তৃপক্ষ জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।
চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটের সত্যতা নিশ্চিত করে এই কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রে প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১২টি ডেলিভারি কিটের প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত জানুয়ারি মাসে পাওয়া গেছে আটটি এবং ফেব্রুয়ারিতে মিলেছে মাত্র দুটি। এরপর থেকে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এম এইচ