আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি : সংসদের বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই নজিরবিহীন রণক্ষেত্রের রূপ নিল দেশের রাজধানী দিল্লির উচ্চ-নিরাপত্তা বলয়। আজ সোমবার ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র পূর্বঘোষিত 'সংসদ চলো' অভিযানকে কেন্দ্র করে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল মধ্য দিল্লির নিরাপত্তা পরিকাঠামো। ব্যারিকেড ভাঙা, দফায় দফায় লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের সেল নিক্ষেপ এবং জলকামান ও দাঙ্গাবিরোধী 'বজ্র' গাড়ির ব্যবহারে কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা এলাকা। কিন্তু পুলিশের এই চরম দমনপীড়ন ও সর্বাত্মক বাধা সত্ত্বেও সিজেপি-র হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে পুরোপুরি রোখা যায়নি। সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে সোমবার দুপুরে বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশ সংসদ ভবনের মূল ফটকের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যান। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক হয়ে দাঁড়ায় যে, নিরাপত্তার স্বার্থে তড়িঘড়ি সংসদের প্রধান ফটক বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
বাদল অধিবেশনের প্রথম দিন হওয়ায় আজ সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য ও বিভিন্ন দলের সাংসদেরা উপস্থিত ছিলেন। ফলে দিল্লি পুলিশ আগে থেকেই সতর্ক ছিল এবং ৫ হাজারেরও বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করে গোটা নতুন দিল্লি জেলাকে ১৫টি সেক্টরে ভাগ করে ফেলেছিল। সিএপিএফ-এর ২৫টিরও বেশি ব্যাটালিয়ন কৌশলগত অবস্থানগুলিতে পাহারায় ছিল। তা সত্ত্বেও যন্তর মন্তর থেকে শুরু হওয়া মিছিল এগোতেই যন্তর মন্তর, কনস্টিটিউশন ক্লাব, রেল ভবন, শাস্ত্রী ভবন, জনপথ ও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সংলগ্ন এলাকায় দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের খণ্ডযুদ্ধ বাধে।
আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টা করলে শাস্ত্রী ভবন ও রেল ভবনের সামনে পুলিশ নৃশংসভাবে লাঠিচার্জ করে এবং একের পর এক কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটায়। কনস্টিটিউশন ক্লাবের সামনেও জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে লাঠি, কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়। বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে বাণিজ্যিক কেন্দ্র কননট প্লেসেও, যার ফলে আউটার সার্কেলের যান চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। নিরাপত্তার খাতিরে দিল্লির বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং যন্তর মন্তর চত্বরে ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে সিগন্যাল জ্যামার বসানো হয়।
পুরো সেন্ট্রাল ভিস্তা করিডোরকে কার্যত ‘নো-মুভমেন্ট জোন’ হিসেবে সিল করে দেওয়া হয়। পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযানের মুখে সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে-সহ বহু বিক্ষোভকারীকে আটক করে বাসে চাপিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ বর্বরোচিত দমনমূলক আচরণ করেছে। আন্দোলনকে সমর্থন করার জন্য দেশের সমস্ত সাংসদের কাছে আর্জি জানিয়েছে সিজেপি।
উল্লেখ্য, সকালে এই কর্মসূচিতে শামিল হয়েছিলেন সমাজবাদী পার্টির (এসপি) সাংসদ তথা অখিলেশ যাদবের পত্নী ডিম্পল যাদব। সমাজবাদী পার্টির দাবি, ডিম্পল যাদব এবং দলের অন্য নেতা-কর্মীদেরও আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। সাম্প্রতিক নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের বিরুদ্ধে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতেই এই 'সংসদ চলো' অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছিল।
সিজেপি-র পক্ষ থেকে সরকারের কাছে তিনটি মূল দাবি পেশ করা হয়েছে— অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে দ্রুত হাসপাতাল থেকে মুক্তি দেওয়া, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে ইস্তফা এবং নিট কেলেঙ্কারির জেরে আত্মঘাতী হওয়া পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ প্রদান। দিল্লির রাজপথে যখন এই তুমুল অশান্তি চলছে, তখনই আন্দোলনের তীব্রতায় বাধ্য হয়ে সরকারের তরফ থেকে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় বলে দাবি উঠেছে|
সিজেপি-র প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস এবং অন্যতম মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে. পি. নাড্ডার বাসভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন। রাজপথের এই নজিরবিহীন প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই মোদী সরকারকে যে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব