আশিস গুপ্ত, নয়া দিল্লি: জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কাঠামো কনভেনশনের নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিয়েল বলেছেন, প্যারিস চুক্তির পর বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, কিন্তু এখন আর নতুন প্রতিশ্রুতির সময় নয়, বরং বিদ্যমান অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সময়। ভারতের তিন দিনের সফরে এসে, কপ৩১ সম্মেলনের আগে তিনি বলেন, "কপ ৩১-কে এমন একটি সম্মেলনে পরিণত হতে হবে, যেখানে বাস্তবায়নের প্রকৃত অর্থ স্পষ্ট হয়ে উঠবে।"
স্টিয়েলের বক্তব্য, প্যারিস চুক্তির আগে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা ছিল। বর্তমানে সেই সম্ভাব্য বৃদ্ধি কমে প্রায় ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। তাঁর মতে, "এটি প্রমাণ করে যে প্যারিস চুক্তি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে এখনও অনেক পথ বাকি।"
তিনি বলেন, কপ ৩১-এ সাফল্যের মাপকাঠি হবে নতুন ঘোষণা নয়, বরং সরকারগুলি ইতিমধ্যে গৃহীত জলবায়ু প্রতিশ্রুতিকে কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারছে। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা চলবে, কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ভিত্তি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভারতকে "সৌরশক্তির পরাশক্তি" আখ্যা দিয়ে স্টিয়েল বলেন, আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য শক্তি সংস্থা -র তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র গত বছরই সৌরশক্তি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের ফলে ভারত প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ব্যয় সাশ্রয় করেছে। তিনি জানান, ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতের সৌর প্যানেল উৎপাদন ক্ষমতা ৭৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য শক্তি সংস্থা-র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচের বিচারে ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক সৌরশক্তির বাজার। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলির তুলনায় ভারত আরও কম খরচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। তিন দিনের ভারত সফরে স্টিয়েল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক, নীতি আয়োগ, নবায়নযোগ্য শক্তি মন্ত্রক এবং বিদেশ মন্ত্রকের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল কপ ৩১-এ ভারতের প্রস্তুতি, জলবায়ু আলোচনায় ভারতের অগ্রাধিকার, জ্বালানি রূপান্তর, বিদ্যুতায়ন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার।
তিনি বলেন, ভারতের সামনে যে সুযোগগুলি তৈরি হয়েছে এবং দ্রুত পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তরের পথে যে চ্যালেঞ্জগুলি রয়েছে, সেগুলি বোঝাই এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে ভারতের অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলির জন্যও শিক্ষণীয় হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিদেশ মন্ত্রকের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের বহুপাক্ষিক জলবায়ু প্রক্রিয়ার প্রতি দৃঢ় সমর্থনের প্রশংসা করেন স্টিয়েল। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ভারত জলবায়ু কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সফরকালে তিনি বেসরকারি শিল্প ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বলে জানান, যাতে জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রসঙ্গে স্টিয়েল বলেন, বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশেই এখন এর প্রভাব স্পষ্ট। ইউরোপের মতো যেসব অঞ্চলে আগে তীব্র গরম স্বাভাবিক ছিল না, সেখানেও রেকর্ড তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি দাবানল, খরা এবং আটলান্টিক অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের তীব্রতা বৃদ্ধি জলবায়ু সংকটের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
তাঁর মন্তব্য, "যাঁরা এতদিন জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, তাঁদের চোখও এখন খুলতে শুরু করেছে।" মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান প্রশাসনের সিদ্ধান্তে প্যারিস চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালেও স্টিয়েল জানান, ১৪৯টি দেশ এখনও প্যারিস চুক্তির প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। তাঁর কথায়, "যুক্তরাষ্ট্র না থাকলেও বাকি দেশগুলির প্রতিশ্রুতি অটুট রয়েছে এবং আমরা সেই প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করব।" জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে ভারতের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা (গ্রিড), শক্তি সঞ্চয় (স্টোরেজ) এবং বিদ্যুতায়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর মতে, কপ ৩১-এ এই বিষয়গুলিই অন্যতম অগ্রাধিকার হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে যৌথ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। অভিযোজন খাতে অর্থায়ন এখনও সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বলে মন্তব্য করেন স্টিয়েল।
তাঁর মতে, কার্বন নির্গমন কমানো এবং বিদ্যুতায়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও অভিযোজন প্রকল্পে বাণিজ্যিক লাভের সম্ভাবনা কম হওয়ায় অর্থের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাকুতে অনুষ্ঠিত কপ২৯ সম্মেলনে নতুন জলবায়ু অর্থায়ন কাঠামো এবং ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার সংগ্রহের রোডম্যাপ নিয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে এই বিপুল অর্থ শুধুমাত্র সরকারি তহবিল থেকে আসবে না। সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতকে উদ্ভাবনী অর্থায়নের পথ খুঁজে বের করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। কপ ৩১ সম্পর্কে স্টিয়েল বলেন, এবারের সম্মেলনে বড় কোনও নতুন ঐতিহাসিক চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং দেশগুলিকে তাদের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান-এর বাস্তব অগ্রগতি তুলে ধরতে হবে।
কপ ৩০-এ ব্রাজিলে গ্রিড স্টোরেজে যে আর্থিক প্রতিশ্রুতিগুলি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলির বাস্তবায়নও কপ ৩১-এর সাফল্যের অন্যতম সূচক হবে। ভারতকে জলবায়ু আলোচনায় "একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর" বলে উল্লেখ করে স্টিয়েল বলেন, উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ তুলে ধরার পাশাপাশি নিজেদের অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেও ভারত অন্যান্য দেশের কাছে একটি কার্যকর উদাহরণ হয়ে উঠেছে।সম্প্রতি বন-এ অনুষ্ঠিত জলবায়ু বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেখানে মিশ্র ফলাফল মিলেছে এবং কপ ৩১-এর আগে এখনও বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো বাকি।জলবায়ু আলোচনায় "কমন বাট ডিফারেনশিয়েটেড রেসপনসিবিলিটিজ" -এর নীতি এখনও সম্পূর্ণভাবে বহাল রয়েছে বলে স্পষ্ট করেন স্টিয়েল।
তাঁর মতে, প্যারিস চুক্তি প্রতিটি দেশের দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সব দেশ যেন সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে।একই সঙ্গে তিনি জানান, প্যারিস চুক্তির দশ বছর এবং জাতিসংঘের জলবায়ু কনভেনশনের তিন দশক পূর্তিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। বন বৈঠকে প্রাথমিক কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে এবং এ বছরই সদস্য দেশগুলির সঙ্গে বিস্তৃত পরামর্শের পর চূড়ান্ত সুপারিশ প্রকাশ করা হবে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব