ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: বর্ষা মৌসুমে ঠাকুরগাঁওয়ে নদী-পুকুরের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। জেলার ৩৬টি নদীর ৬৯২ দশমিক ৪ কিলোমিটার নদীপথ এবং প্রায় ২১ হাজার পুকুর-দীঘি থাকলেও স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের কোনো কেন্দ্রে উদ্ধারকারী ডুবুরি দল নেই। ফলে দুর্ঘটনার পর রংপুর থেকে ডুবুরি দল আসতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগছে। এতে জীবিত উদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হয়ে যাচ্ছে।
জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঠাকুরগাঁওয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির পাঁচটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন রয়েছে। এসব স্টেশনে ১৩১টি অনুমোদিত পদ থাকলেও কোনো স্টেশনে উদ্ধারকারী ডুবুরির পদ নেই। পানিতে কেউ নিখোঁজ হলে রংপুরের ডুবুরি দলের ওপরই নির্ভর করতে হয়।
জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সাহিদুল ইসলাম বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে ডুবুরির কোনো পদ না থাকায় নদী বা বড় জলাশয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে রংপুর থেকে দল আনতে হয়। দূরত্বের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লেগে যায়, যা দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় বড় বাধা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান জানান, জেলার ৩৬টি নদীর মোট দৈর্ঘ্য ৬৯২ দশমিক ৪ কিলোমিটার। বর্ষায় বড় নদীগুলোর পানির গভীরতা ২৫ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত হয়। শুষ্ক মৌসুমেও অনেক নদীতে প্রায় ৫ ফুট পানি থাকে। নদীকেন্দ্রিক কৃষিকাজ, গৃহস্থালি কাজ ও পশুপাখি গোসল করানোর কারণে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এসব নদী ব্যবহার করেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার সরকার জানান, জেলার পাঁচ উপজেলায় বাণিজ্যিক ও পারিবারিক মিলিয়ে প্রায় ২১ হাজার পুকুর ও দীঘি রয়েছে। বর্ষায় এসব জলাশয় পানিতে পূর্ণ থাকে। অপরিকল্পিতভাবে গভীর পুকুর খনন ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।
গত ২১ জুলাই পীরগঞ্জের উত্তর মালঞ্চা এলাকায় টাঙ্গন নদী পার হওয়ার সময় মহাদেব চন্দ্র রায় (২৩) পানিতে ডুবে মারা যান। এর আগের দিন রানীশংকৈলের টেকিয়া মহেষপুরে পুকুরে পড়ে প্রাণ যায় ছয় বছরের শিশু ফয়সাল আলীর। ১৯ জুলাই ভূল্লী থানার সারডুবি এলাকায় পাথররাজ নদী পার হয়ে জমিতে যাওয়ার সময় নিখোঁজ হন ৭০ বছর বয়সী শ্রী মোহন্ত রায়। পরদিন রংপুরের ডুবুরি দল তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। ১৮ জুলাই বালিয়াডাঙ্গীর নাগর নদীতে গরুকে গোসল করাতে গিয়ে ১৪ বছরের কিশোরী সুমি আক্তার নিখোঁজ হন; পরে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জিআরও শাখা ও সংশ্লিষ্ট থানা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২ জানুয়ারি থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় জেলার বিভিন্ন থানায় ৪৪টি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জিআরও ফরিদুজ্জামান জানান, বর্ষা মৌসুমে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর আসছে। নিহতদের মধ্যে শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও পুরুষ রয়েছেন।
স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, ছয় শতাধিক কিলোমিটার নদীপথ ও হাজার হাজার জলাশয় থাকা সত্ত্বেও জেলায় কোনো ডুবুরি দল না থাকা উদ্ধারব্যবস্থার বড় দুর্বলতা। তাদের দাবি, স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল থাকলে দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে অনেক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সরদার মোস্তফা শাহীন বলেন, নদী ও খালের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে জেলায় জরুরি ভিত্তিতে ফায়ার সার্ভিসে স্থায়ী ডুবুরি পদ সৃষ্টি ও পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দাপ্তরিক চিঠি পাঠানো হবে।