ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: জেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন ও ভুয়া প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন সরকারি উপবৃত্তি ও অনুদান পেয়ে আসা ঠাকুরগাঁওয়ের কথিত ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা’র উপবৃত্তি বন্ধ করেছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
একই সঙ্গে ভুয়া প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে নতুন করে লিখিত আবেদন করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের দাখিল ও ইবতেদায়ী শাখার সহকারী পরিচালক ইবাদাৎ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর অস্তিত্বহীন ওই প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত উপবৃত্তি স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নথিপত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ১৯ নম্বর বেগুনবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব বেগুনবাড়ী এলাকায় ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা’ (পুরাতন কোড ৮০০৫০১২৯০৪, নতুন কোড: ০০১১৩৮২০২৫) নামে বাস্তবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। অথচ কাগজে-কলমে এই প্রতিষ্ঠানের নামে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি উপবৃত্তি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা উত্তোলন করা হচ্ছিল।
সম্প্রতি জাতীয় গণমাধ্যমে ‘ঠাকুরগাঁওয়ে ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠান, অস্তিত্ব নেই তবুও মিলছে উপবৃত্তি’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে পুনরায় প্রতিকার চেয়ে আবেদন করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রকৃত ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা’ পরবর্তীতে দাখিল পর্যায়ে উন্নীত হয়ে ২০০২ সালে এমপিওভুক্ত হয়। কিন্তু একটি প্রভাবশালী জালিয়াত চক্র পুরোনো ইবতেদায়ী শাখার নাম ও কোড ব্যবহার করে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে একটি অস্থায়ী টিনশেড ঘরকে নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চালায়। এ বিষয়ে প্রকৃত দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষকরা স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেন।
এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে এলাকাবাসীর পক্ষে ফারুক হোসেন জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই বছরের ৬ এপ্রিল জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করেন, উক্ত নামে বাস্তবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। তদন্ত চলাকালে কথিত প্রধান শিক্ষক শাহিনুর আলম বৈধ কোনো কাগজপত্র কিংবা শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত রেজুলেশন দেখাতে পারেননি।
ওই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঠাকুরগাঁও সমন্বিত জেলা কার্যালয় একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে। দুদকের তদন্তেও কথিত মাদ্রাসাটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তদন্ত শেষে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ বন্ধের পাশাপাশি তৎকালীন ও বর্তমান সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, দুদকের সুপারিশপ্রাপ্ত সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ মো. মোকাদ্দেশ ইবনে সালাম এবং সম্প্রতি অবসরে যাওয়া সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমানের যোগসাজশে ভুয়া প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন সরকারি সুবিধা পেয়ে আসছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পূর্ব বেগুনবাড়ী দাখিল মাদ্রাসার সুপার আব্দুল মতিনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কথিত প্রধান শিক্ষক শাহিনুর আলম ভুয়া মাদ্রাসাটি পরিচালনা করতেন। নিজেদের আত্মীয়স্বজনদের শিক্ষক দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। এমনকি জালিয়াতি নির্বিঘ্ন করতে শাহিনুর আলমকে প্রকৃত দাখিল মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতিও করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুদক ও জেলা প্রশাসনের তদন্তে প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া হিসেবে প্রমাণিত হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে উপবৃত্তি বন্ধের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তারা অবিলম্বে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের কোড বাতিল, এমপিওভুক্তির সব ধরনের অপচেষ্টা বন্ধ এবং আব্দুল মতিন, শাহিনুর আলমসহ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম