স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশে চলমান হামের বড় প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও ভাইরাসে এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বর্তমানে ব্যবহৃত হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যেতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত এক প্রাথমিক অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
শনিবার (২ আগস্ট) প্রকাশিত অনুসন্ধানের ফলাফলে সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে ছড়িয়ে পড়া হাম ভাইরাস বি৩ জিনোটাইপের, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও শনাক্ত হয়েছে। তবে ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন টিকার কার্যকারিতা নষ্ট করেছে, এমন কোনো প্রমাণ গবেষকেরা পাননি।
আইসিডিডিআরবি বলছে, চলমান প্রাদুর্ভাবের কারণে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল সেই আশঙ্কাকে সমর্থন করে না। বরং সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ১৫ হাজার ২৭২ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে হামজনিত বলে সন্দেহ করা ৭২১টি এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত ৯৫টি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে আইসিডিডিআরবি ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা গত ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ জন সন্দেহভাজন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করেন। এর মধ্যে ৩২৪ জনের হাম পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি, এমন ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা। তিন থেকে আট মাস বয়সী ১৪১ শিশুর মধ্যে ১৩৭ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।
গবেষণায় বয়স ও টিকাদানের ভিত্তিতে শিশুদের চারটি দলে ভাগ করা হয়। এতে দেখা যায়, ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জন (৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ), টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জন (৯৭ শতাংশ), এক ডোজ টিকা পাওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জন (৯২ শতাংশ) এবং দুই ডোজ টিকা পাওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের (৭৬ শতাংশ) হাম শনাক্ত হয়েছে।
তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এই তথ্যের অর্থ এই নয় যে দুই ডোজ টিকা পাওয়া সব শিশুর ৭৬ শতাংশ হামে আক্রান্ত হচ্ছে। কারণ অনুসন্ধানটি শুধু হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সন্দেহভাজন রোগীদের ওপর পরিচালিত হয়েছে। তাই এই ফলাফল থেকে জাতীয় পর্যায়ে টিকার সামগ্রিক কার্যকারিতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, চলমান প্রাদুর্ভাবে ভাইরাস টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কে জনসংখ্যা পর্যায়ের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বড় পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষণায় ভাইরাসের ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি নমুনা আইসিডিডিআর,বি এবং ৩৭টি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) সিকোয়েন্স করেছে। বিশ্লেষণে ভাইরাসের এইচ প্রোটিনের এপিটোপ অঞ্চলে চারটি মিউটেশন শনাক্ত হলেও গবেষকেরা বলছেন, এসব পরিবর্তন আগে অন্যান্য দেশেও পাওয়া গেছে এবং এগুলোর কারণে প্রচলিত টিকা অকার্যকর হয়ে গেছে, এমন প্রমাণ নেই।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে প্রথম এমআর টিকা ৯ মাস এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়। কিন্তু জন্মের পর কয়েক মাসের মধ্যেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়ায় তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়ে।
আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধ এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে জাতীয়ভাবে টিকাদানের হার বেশি বলে জানানো হলেও এত বড় প্রাদুর্ভাব কেন ঘটল, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী ড. কামরুন নাহার বলেন, শিশুরা কেন টিকা থেকে বাদ পড়ছে এবং কোনো কোনো এলাকায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা জরুরি। এসব তথ্য ভবিষ্যতে টিকাদান কৌশল আরও কার্যকর করতে সহায়তা করবে।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলেও এখনো অনেক বিষয় জানা বাকি। বিশেষ করে দুই ডোজ টিকা পাওয়া কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হয়েছে, অপুষ্টি বা অন্য কোনো কারণ এতে ভূমিকা রেখেছে কি না, তা জানতে আরও বিস্তৃত গবেষণা চলছে।
বর্তমানে চারটি বিভাগীয় হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল কোহর্ট গবেষণা, জিনোমিক নজরদারি, শিশুদের রোগপ্রতিরোধ সক্ষমতা, জিঙ্কের কার্যকারিতা এবং কেন কিছু শিশু টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে, এসব বিষয় নিয়ে পৃথক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে আইসিডিডিআর,বি।
গবেষকেরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শিশুর বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই হাম-রুবেলা টিকার সব ডোজ নিশ্চিত করতে হবে এবং চলমান প্রাদুর্ভাবের সময়ে সরকারের টিকাদানসংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব