রিপোর্টর্স২৪ ডেস্ক: বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সময় যে বিধিমালা কার্যকর ছিল, পরবর্তীতে তা পরিবর্তন করে নতুন কোনো শর্ত আরোপ করে শিক্ষক-কর্মচারীদের অর্জিত আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না—এমন গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেছেন, নিয়োগকালীন বিধিমালা উপেক্ষা করে পরবর্তী সময়ে প্রণীত কোনো শর্ত বা বিধিকে অতীত থেকে কার্যকর দেখিয়ে আগে থেকেই চাকরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আইনগত অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।
এমপিও সংক্রান্ত চার শিক্ষকের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে দেওয়া রায়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ‘মো. আবু হানিফ ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য’ শীর্ষক মামলায় আদালত এসব পর্যবেক্ষণ দেন।
গত ৩০ জুন বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি উর্মি রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত হয়েছে। মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি বিচারপতি উর্মি রহমান।
রায় ঘোষণার সময় রিটকারীদের পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী মো. আতাউর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ ওয়ালিউল ইসলাম অলি ও মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান।
মামলার পটভূমি
মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রবিধান, অর্থাৎ রেগুলেশন ২০১৫ অনুসরণ করে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার রোজি মোজাম্মেল মহিলা কলেজে অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, ইংরেজি ও সমাজকল্যাণ বিভাগে প্রভাষক (তৃতীয় শিক্ষক) পদে মো. আবু হানিফসহ চারজন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়।
২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর তাদের নিয়োগ সম্পন্ন হয় এবং পরদিন ৩০ ডিসেম্বর তারা সংশ্লিষ্ট কলেজে প্রভাষক পদে যোগদান করেন।
পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তারিখের এনটিআরসিএ পরিপত্রের আগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত এবং ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়।
সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) প্রকাশিত ৭২৬ জন শিক্ষকের তালিকায় মো. আবু হানিফসহ ওই চার শিক্ষকের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে অনলাইন প্রক্রিয়ায় তাদের এমপিও আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। আবেদনের সঙ্গে ‘NTRCA সনদ নেই’—এই কারণ দেখিয়ে তাদের এমপিওভুক্তির আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।
পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে চার শিক্ষক হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
নিয়োগের সময়কার বিধিমালাই প্রাধান্য পাবে
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিক প্রয়োজনে চাকরির বিধিমালা পরিবর্তন বা পরিমার্জন করার এখতিয়ার রাখে। তবে পরবর্তীতে বিধিমালায় পরিবর্তন এনে আগে থেকেই চাকরিতে যোগদানকারী কোনো কর্মচারীর অর্জিত অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন করা যাবে না।
আদালত নিয়োগকালীন প্রবিধানের প্রাধান্যের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ২০১৫ সালে যখন এই চার শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় এনটিআরসিএ সনদের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।
ডিগ্রি (পাস) পর্যায়ের কলেজ শিক্ষকদের জন্য এনটিআরসিএ সনদের বাধ্যবাধকতা পরবর্তী সময়ে, ২০১৯ সালের প্রবিধানে প্রথমবারের মতো যুক্ত করা হয়। ফলে ২০১৫ সালে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে চালু হওয়া এই শর্ত আরোপ করা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে আদালত মনে করেছেন।
‘তৃতীয় শিক্ষক’ পদ নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিও খারিজ
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তৃতীয় শিক্ষক পদটি জনবল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে আদালত এই দাবির সঙ্গে একমত হননি।
হাইকোর্ট বলেছেন, সরকার নিজেই বিভিন্ন সময়ে একাধিক পরিপত্র জারি করে তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিও সুবিধার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে তৃতীয় শিক্ষক পদটি জনবল কাঠামোয় নেই—রাষ্ট্রপক্ষের এমন দাবির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, এমপিও মঞ্জুর করা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় হলেও, সেই সিদ্ধান্ত যদি কোনো যুক্তিসঙ্গত আইনগত ভিত্তি ছাড়া খেয়ালখুশিমতো বা স্বেচ্ছাচারীভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিচার্য বিষয় হতে পারে।
এনটিআরসিএ সনদ না থাকার অজুহাতে এমপিও বাতিল বাতিল
চূড়ান্ত রায়ে হাইকোর্ট এনটিআরসিএ সনদ না থাকার অজুহাতে চার প্রভাষকের এমপিও আবেদন প্রত্যাখ্যানের অনলাইন সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছেন।
একই সঙ্গে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস থেকে রিটকারী চার শিক্ষককে মান্থলি পে অর্ডার (এমপিও) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে প্রযোজ্য সব বকেয়া ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাসহ চার রিটকারীকে পাওনা পরিশোধের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে নিয়োগের সময় বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী চাকরিতে যোগদান করা শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে পরবর্তীতে নতুন শর্ত আরোপ করে তাদের অর্জিত আইনগত অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দৃষ্টান্ত তৈরি হলো।
রিপোর্টর্স২৪/ঝুম