রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহের কারণে প্রতি বছর শ্রমিকদের মজুরি বাবদ ক্ষতি হচ্ছে অন্তত ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশের সমান। এর বাইরে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যজনিত ব্যয়ের কারণে শ্রমিকদের যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তা রয়েছে হিসাবের বাইরে।
‘নো এসকেপিং দ্য হিট: হেলথ অ্যান্ড ইকোনমিক ইমপ্যাক্টস অব হিট স্ট্রেস অন ইনফরমাল ওয়ার্কার্স ইন আরবান বাংলাদেশ’ শীর্ষক সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাইরে তীব্র গরমে কাজ করা শ্রমিকেরা বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭ কর্মদিবস হারান। অন্যদিকে ছাদের নিচে কাজ করা শ্রমিকেরা হারান গড়ে ১৩ দশমিক ৫ কর্মদিবস।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইইডি) এবং বেসরকারি সংস্থা অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এই গবেষণা পরিচালনা করে।
গবেষণার অংশ হিসেবে নির্মাণকাজ, রিকশা চালানো ও পোশাক তৈরিসহ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত ঢাকার ১৭৫টি পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশ এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত।
সাক্ষাৎকার নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ১২২টি পরিবার নির্মাণকাজ, সড়ক নির্মাণ ও রিকশা চালানোর মতো বাইরে করতে হয় এমন কাজে নিয়োজিত ছিল। আর ৫৩টি পরিবার মূলত পোশাকশিল্পে ছাদের নিচে বসে করা কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
গবেষকেরা শ্রমিকদের কাজ ও বিশ্রামের সময় পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দলীয় আলোচনা, সাক্ষাৎকার ও পারিবারিক কেস স্টাডি করেন। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ফলাফল পর্যালোচনা করেন তিনজন চিকিৎসকের একটি প্যানেল। জাতীয় অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে গবেষকেরা গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে জাতীয় শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য এবং বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রার তথ্য সমন্বয় করেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই তীব্রতর হয়ে ওঠা তাপপ্রবাহ শুধু শ্রমিকদের আয় কমাচ্ছে না, একইসঙ্গে তাদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবিকাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবারগুলো। তাদের জীবনযাপন মূলত দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল। নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক ও পোশাকশ্রমিকদের মতো অনেকেরই তীব্র গরমে কাজ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত।
বাইরে এবং ছাদের নিচে কাজ করা শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, তীব্র গরমের কারণে তাদের বছরে যথাক্রমে প্রায় ২৪ ও ১৪ দিন কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, তীব্র গরমের কারণে বাইরে কাজ করা শ্রমিকেরা তাদের বার্ষিক আয়ের প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ গড়ে ১৯ হাজার টাকা হারিয়েছেন। অন্যদিকে ছাদের নিচে কাজ করা শ্রমিকেরা হারিয়েছেন প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ গড়ে ১২ হাজার টাকা।
আয় হারানোর কারণে এসব পরিবারের জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ, এমনিতেই তাদের বর্তমান আয় দিয়ে ঢাকার মতো ব্যয়বহুল শহরে জীবনযাপন করা কঠিন।
গবেষণায় স্বাস্থ্যগত ক্ষতিরও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা বারবার পানিশূন্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিডনি ক্ষতির উপসর্গের কথা জানিয়েছেন।
তীব্র গরমের মৌসুমে শ্রমিকদের মানসিক চাপও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অনেক শ্রমিক মন খারাপ, উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ, ঘুমের সমস্যা এবং কাজে বেশি ভুল করার কথা জানিয়েছেন।
গবেষণার ফলাফল বলছে, তাপপ্রবাহ শুধু কর্মক্ষমতা ও আয় কমাচ্ছে না, বরং দারিদ্র্যকেও আরও গভীর করে তুলছে। ঢাকায় জীবনযাত্রার উপযোগী মজুরি বছরে প্রায় ২ হাজার ৯৯৭ ডলার। অথচ বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের পরিবারের গড় বার্ষিক আয় মাত্র ১ হাজার ৭৫৬ ডলার। ছাদের নিচে কাজ করা শ্রমিকদের পরিবারের গড় আয় ১ হাজার ৯৮৫ ডলার।
তাপজনিত আয়হানি হিসাবের বাইরে রাখলেও এসব পরিবারের আয় জীবনযাত্রার উপযোগী মজুরির চেয়ে ৩৪ থেকে ৪১ শতাংশ কম। আর হারানো আয় হিসাব করলে বাইরে ও ছাদের নিচে কাজ করা শ্রমিকদের পরিবারের আয় নেমে আসে যথাক্রমে ১ হাজার ৬০৭ ও ১ হাজার ৮৯৬ ডলারে।
ফলে জীবনযাত্রার উপযোগী মজুরির সঙ্গে তাদের আয়ের ব্যবধান আরও বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ ও ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশে।
গবেষণাটি বলছে, তীব্র তাপপ্রবাহের এই অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে সেই শ্রমজীবী মানুষের ওপর, যাদের দৈনন্দিন জীবনে কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহ এখন শুধু আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি নয় এটি শ্রমিকদের আয়, স্বাস্থ্য ও জীবিকার জন্যও বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম