কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: একসময় বর্ষা এলেই হাঁটুসমান কাদা, শুকনো মৌসুমে ধুলাবালি আর ভাঙাচোরা পথ জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার মূলগ্রাম ও সীতাহার-নয়াপাড়া এলাকার মানুষের কাছে এমন দুর্ভোগ ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। কৃষিপণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ মানুষের চলাচল সব ক্ষেত্রেই ছিল ভোগান্তি। জরুরি প্রয়োজনে যানবাহন পাওয়াও ছিল কঠিন।
তবে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। সবুজ ধানক্ষেতের বুক চিরে নির্মিত হয়েছে পেভিং ব্লক ও আরসিসি সড়ক। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি সুপারি গাছ, নির্দিষ্ট দূরত্বে সৌর বিদ্যুৎচালিত স্ট্রিটলাইট, বসার বেঞ্চ আর চারদিকে বিস্তৃত কৃষিভূমি সব মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদটি পেয়েছে নান্দনিক এক নতুন রূপ। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি এলাকাটি এখন স্থানীয়দের অবকাশযাপন, সকাল-বিকেলের হাঁটা এবং প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের জায়গাতেও পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মূলগ্রাম ও সীতাহার-নয়াপাড়া এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ আরসিসি ও পেভিং ব্লক সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি মূলগ্রামের অভ্যন্তরে আরও প্রায় ৯০০ মিটার সড়কে পেভিং ব্লক বসানো হয়েছে। দুই সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
সড়কের দুই পাশে সারি সারি সুপারি গাছের পাতার মৃদু দোল, নির্দিষ্ট দূরত্বে বসানো সৌরচালিত স্ট্রিটলাইট এবং পথচারীদের বিশ্রামের জন্য স্থাপন করা বেঞ্চ পুরো পরিবেশকে দিয়েছে নান্দনিক রূপ। সন্ধ্যার পরও সোলার লাইটের আলোয় নিরাপদে চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আর রাস্তার দুপাশে বিস্তৃত সবুজ ফসলের মাঠ পুরো এলাকাকে দিয়েছে মনোরম আবহ।
শুধু সৌন্দর্য নয়, নতুন সড়কটি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। আগে বর্ষায় জমি থেকে ধান, সবজি বা অন্যান্য ফসল বের করতে কৃষকদের অনেকটা পথ মাথায় কিংবা ভ্যানে করে পাড়ি দিতে হতো। কাদায় আটকে যেত ভ্যান-অটোরিকশা। এখন ট্রাক, ভ্যান, অটোভ্যান, সিএনজি এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও সহজে গ্রাম ও কৃষিজমির কাছাকাছি যেতে পারছে।
মূলগ্রাম এলাকার গৃহিণী আফরুজা বেগম বলেন, আমি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ায় প্রতিদিন হাঁটতে হয়। আগে কাদা-মাটির কারণে হাঁটতে কষ্ট হতো। এখন সুপারি গাছে ঘেরা সতেজ পরিবেশে হাঁটতে খুব ভালো লাগে। এত দ্রুত এত সুন্দর রাস্তা হবে, তা কল্পনার বাইরে ছিল।
সীতাহার-নয়াপাড়া সড়কে স্থানীয় আবু সাঈদ, আব্দুন নূর, নুরুন্নবীসহ নয়জন কৃষক ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, আগে বর্ষাকালে গ্রামের ভেতরে কাদা জমে থাকায় মোটা অংকের টাকা দিয়েও ভ্যান বা অটোভ্যান পাওয়া যেত না। কৃষিপণ্য কেনাবেচা, রোগী পরিবহন কিংবা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো।
তাদের ভাষ্য, এখন সেই পরিস্থিতি নেই। কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে নেওয়া যাচ্ছে। গুরুতর অসুস্থ রোগীকেও দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ভ্যান, অটোভ্যান, সিএনজি থেকে শুরু করে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত এখন সহজেই চলাচল করতে পারছে। অতীতের দুর্ভোগের কথা মনে করলে বর্তমান পরিস্থিতিকে তাদের কাছে বড় পরিবর্তন বলেই মনে হচ্ছে।
মূলগ্রামের কৃষক সুলতান, চঞ্চল, শামসুল ও শাহীনুর জানান, আগে বর্ষাকালে জমি থেকে ধান বা সবজি বের করা ছিল চরম কষ্টের কাজ। কাদার কারণে অনেক সময় ফসল মাঠেই পড়ে থাকত। এখন পাকা সড়ক হওয়ায় ট্রাক-ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন মাঠের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছে। এতে ফসল পরিবহনের সময়, শ্রম ও খরচ—তিনটিই কমেছে।
নতুন সড়কের সৌন্দর্যে মুগ্ধ রাজশাহী মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাবরিনা আক্তার শম্পা। জয়পুরহাট সদর উপজেলার করিমনগর গ্রাম থেকে কালাইয়ে ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে এসে তিনি বলেন, “সারি সারি সুপারি গাছগুলো দেখে মনে হয় যেন আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। রাস্তার পাশে বেঞ্চে বসে খোলা মাঠের হাওয়া উপভোগ করা সত্যিই অসাধারণ। রাতে সোলার লাইটের আলোয় এই পরিবেশ আরও অনবদ্য রূপ নেবে।”
কালাই পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গত এক বছরে পৌর এলাকায় প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ১৮ কিলোমিটার রাস্তা ও পাঁচ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল পাচ্ছেন পৌরসভার ২৩ হাজার ৬৬৩ জন নাগরিক।
সূত্রটি আরও জানায়, জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং জনপ্রশাসন ও খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল বারীর বিশেষ বরাদ্দে মহাসড়ক, মূলগ্রাম, সীতাহার, থুপসাড়া, আওড়া, সড়াইল, মুন্সীপাড়া, পাঁচশিরা এবং স্থানীয় হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে মোট ৩৫টি ছোট-বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
থুপসাড়া সেলিমীয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা মতিউর রহমান বলেন, “১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত আমাদের মাদ্রাসাটি যোগাযোগ সুবিধা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে বছরের পর বছর বঞ্চিত ছিল। মাদ্রাসার দক্ষিণ দিয়ে জয়পুরহাট-মোকামতলা আঞ্চলিক মহাসড়কে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের যে সড়কটি মাদ্রাসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, সেটির আরসিসি কাজ বর্তমানে কালাই পৌরসভা শুরু করেছে। রাস্তার দুই পাশে সুপারি গাছের চারা রোপণ করা হচ্ছে। এতে রাস্তাটি দৃষ্টিনন্দন হচ্ছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও—এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
কালাই উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নওশাদ জানান, কালাই পৌরসভা এলাকায় ফসলের জমি, বসতবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩১০ হেক্টর। এর মধ্যে ফসলি জমি রয়েছে প্রায় ৮১৫ হেক্টর।
কালাই সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. আব্দুল ওহাব সাখিদারের হিসাবে, পাকা সড়ক নির্মাণের ফলে কৃষকদের ফসল পরিবহনে প্রতি বিঘায় গড়ে অন্তত ১ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।
তিনি জানান, ৮১৫ হেক্টর ফসলি জমি প্রায় ৬ হাজার ১১২ বিঘার সমান। ফলে প্রতি ফসলি মৌসুমে কৃষকদের পরিবহন ব্যয় কমছে আনুমানিক ৬১ লাখ টাকা। পৌরসভা এলাকার অধিকাংশ জমি তিন ফসলি হওয়ায় বছরে এ সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি টাকা।
তবে পাকা সড়কের সুফল শুধু পরিবহন ব্যয় কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সড়ক নির্মাণের কারণে রাস্তার আশপাশের জমির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানান আব্দুল ওহাব সাখিদার।
তার ভাষ্য, কিছুদিন আগেও যেসব জমির প্রতি শতকের দাম ছিল ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা, পাকা সড়ক নির্মাণের পর সেসব জমির দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ কোনো কোনো এলাকায় জমির মূল্য প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
তিনি বলেন, পাকা রাস্তা নির্মাণের ফলে কৃষকের ফসল পরিবহনের খরচ কমেছে, সময় ও শ্রম সাশ্রয় হচ্ছে। একই সঙ্গে সড়কের পাশে জমির মূল্যও বেড়েছে। এর সঙ্গে রাস্তার দুই পাশে পরিকল্পিতভাবে লাগানো সুপারি গাছ যুক্ত হওয়ায় যোগাযোগ অবকাঠামোর পাশাপাশি এ এলাকার পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনে সুপারি গাছকে বেছে নেওয়ার পেছনে পরিবেশগত সুবিধার পাশাপাশি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও রয়েছে। কালাই পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী মহোদয় একযোগে ৩৫টি কাজের উদ্বোধন করার পর আমরা টেকসই ও আধুনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করি। আমাদের মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা সরেজমিনে প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করে দুপাশে সুপারি গাছ, বসার বেঞ্চ ও সোলার লাইটের এই নান্দনিক মডেল দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। এটিকে সারা দেশের পৌরসভার জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে প্রস্তাবের কথাও তিনি জানান।
সুপারি গাছ বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, অন্যান্য বড় গাছ ফসলের আলো-বাতাসে বাধা সৃষ্টি করে জমির ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু সুপারি গাছ পরিবেশবান্ধব এবং ফসল বা জমির কোনো ক্ষতি করে না।
তিনি জানান, বর্তমানে পৌরসভায় রোপণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫০০টি সুপারি গাছ। প্রতিটি গাছ বছরে দুই দফায় গড়ে ৬০০টি ফল দিলে এবং সর্বনিম্ন পাঁচ টাকা দরে বিক্রি করা সম্ভব হলে প্রতি বছর শুধু সুপারি বিক্রি থেকেই পৌরসভার ফান্ডে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা বাড়তি রাজস্ব যোগ হবে।
সাইফুল ইসলাম বলেন, এটি কোনো কল্পনা নয়, বাস্তব হিসাব। ভবিষ্যতে কালাই পৌরসভার নতুন প্রকল্পগুলোতেও একই ধরনের টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও অর্থকরী মডেল অনুসরণ করা হবে।
উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে কৃষি অর্থনীতির বিকাশ, কৃষকের পরিবহন ব্যয় কমানো, জমির মূল্য বৃদ্ধি এবং নান্দনিক পরিবেশ সব মিলিয়ে কালাই পৌরসভার গ্রামীণ জনপদে তৈরি হয়েছে নতুন এক বাস্তবতা। যে পথ একসময় ছিল কাদা, দুর্ভোগ আর অনিশ্চিত চলাচলের প্রতীক, সেই পথই এখন হয়ে উঠেছে উন্নয়ন, সৌন্দর্য ও সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ হলে পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত হবে। পাশাপাশি মূলগ্রাম ও সীতাহার-নয়াপাড়ার মতো পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর এই মডেল পৌরসভার অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়বে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম