রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস-সংকটের পর দেশে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। এলএনজি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত দুটি ভাসমান টার্মিনালের মধ্যে সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আংশিক সক্ষমতায় চালু হওয়ায় শনিবার ভোর থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ বাড়ার কারণে আবাসিক, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সংকটের তীব্রতা কিছুটা কমবে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
এলএনজি আমদানি ও সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার ভোর ৪টা থেকে সামিটের টার্মিনাল থেকে ঘণ্টায় প্রায় ৪৬ কোটি ঘনফুট এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। এর ফলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বর্তমানে দুটি টার্মিনাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আংশিক সক্ষমতায় গ্যাস দিচ্ছে। সরবরাহ বাড়ায় গ্রাহকেরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ রয়েছে। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট।
গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাসাবাড়ির রান্না, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়ে যায়। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। শিল্পকারখানার উৎপাদনেও দেখা দেয় নানা ধরনের সমস্যা।
জানা গেছে, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে দুটি বয়লার রয়েছে। প্রতিটির সক্ষমতা প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিকাণ্ডে একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অপর বয়লারটি ব্যবহার করে গত ৬ আগস্ট গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হয়েছিল।
তবে শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে ওই বয়লার থেকেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে ত্রুটি মেরামত করা হলে শনিবার ভোরে আবার সেই বয়লার থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়।
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। সেটি পুনরায় চালুর আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে। এ কারণে এক্সিলারেটের পুরো টার্মিনাল থেকে কিছু সময়ের জন্য গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় প্রায় ৭২ ঘণ্টা টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ঠিক কখন এই কাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি মেরামত ও পরীক্ষা শেষে চালু করা গেলে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তখন জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ আরও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এলএনজি সংকটের প্রভাব পড়েছিল সামিটের টার্মিনালেও। গত সোমবার এই টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মঙ্গলবার সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত তা আরও কমিয়ে প্রায় ১০ কোটি ঘনফুটে রাখা হয়।
এরপর বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার পর সামিটের টার্মিনাল থেকেও গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে একদিকে এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ, অন্যদিকে সামিটের সরবরাহ বন্ধ থাকায় দেশে গ্যাসের সংকট চরম আকার ধারণ করে।
পরিস্থিতির উন্নতি হয় শুক্রবার। ওই দিন বিকালে ভিটলের একটি এলএনজিবাহী জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে সামিটের টার্মিনালে জাহাজ থেকে এলএনজি খালাস শুরু হয়। প্রায় আট ঘণ্টা পর খালাসের কাজ শেষ হয়।
এর আগেই সন্ধ্যা ৬টা থেকে টার্মিনালে মজুত থাকা এলএনজি ব্যবহার করে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে সামিট। শুরুতে সরবরাহ ছিল প্রায় সাড়ে ৯ কোটি ঘনফুট। পরে শনিবার ভোররাতে তা বেড়ে প্রায় ৪৬ কোটি ঘনফুটে পৌঁছে যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে সামিটের টার্মিনাল থেকে আরও ৭ থেকে ৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক দিনে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সংশ্লিষ্টদের মতে, দৈনিক প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা গেলে মোটামুটি সব খাতে সরবরাহ পরিস্থিতি ধরে রাখা সম্ভব।
তবে স্বাভাবিক সময়েও রেশনিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট।
এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শুক্রবার বিকালে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছিল প্রায় ১৭৩ কোটি ঘনফুটে। এতে আবাসিক গ্রাহক থেকে শুরু করে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত পর্যন্ত ব্যাপক সংকট তৈরি হয়।
দুটি টার্মিনাল পুনরায় চালু হওয়ায় শনিবার গ্যাস সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুট হয়েছে। ফলে সংকটের তীব্রতা কিছুটা কমেছে। তবে স্বাভাবিক সরবরাহের তুলনায় এখনো দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি মেরামত ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা গেলে বর্তমান গ্যাসের ঘাটতি অনেকটাই কমে আসবে।
বিশেষ করে শিল্পকারখানা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলে উৎপাদন পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে। একই সঙ্গে আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার গ্যাস সংকট এবং সিএনজি স্টেশনগুলোর দীর্ঘ অপেক্ষার সমস্যাও ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, দুটি টার্মিনালই পূর্ণ সক্ষমতায় চালু না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা যাচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি দ্রুত মেরামত করে চালু করা এবং এলএনজি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এখন সংকট কাটানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম